জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে নতুন সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, আগামী মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাত ৮টার মধ্যে সব দেশের জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের জন্য সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করে দেবে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী।
তবে, ট্রাম্পের এই হুমকির কড়া জবাব দিয়েছে ইরানও। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরবে না, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য তা চিরতরে বদলে গেছে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) রয়টার্স ও আল জাজিরার পৃথক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে এ তথ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে রোববার একটি পোস্টে ইরানকে আল্টিমেটাম দিয়ে ট্রাম্প লিখেন, ‘মঙ্গলবার, রাত ৮টা পূর্বাঞ্চলীয় সময়!’ পোস্টে এর বেশি আর কিছু লেখেননি তিনি।
পরে একইদিন মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ইরান যদি যুদ্ধবিরতিতে এগিয়ে না আসে এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধই রাখতে চায়, তাহলে তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বলতে আর কিছু থাকবে না। পুরো ইরানে যত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র আছে— সব ধ্বংস করা হবে।’
আগের দিন শনিবারও হরমুজ ইস্যুতে হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘মঙ্গলবার হবে ইরানের জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র আর সেতু দিবস; সব কিছু গুঁড়িয়ে এক করে দেওয়া হবে, এরকম আর হয়নি। এখনই হরমুজ প্রণালি খুলে দাও, পাগল বেজম্মারা, না হলে তোমাদের জাহান্নামে পড়তে হবে। শুধু দেখো, আল্লাহর কাছে দোয়া করো।’
হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে গত কয়েক সপ্তাহে ইরানকে বেশ কয়েকবার এমন আল্টিমেটাম দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে, ইরানও ট্রাম্পের এসব হুমকি-ধমকি পাত্তা না দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এবারও তার আল্টিমেটামের কড়া জবাব দিয়েছে তেহরান।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক বিবৃতিতে ঘোষণা দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরবে না, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য তা চিরতরে বদলে গেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগরের জন্য ইরানের কর্মকর্তারা যাকে ‘নতুন ব্যবস্থা’ বলে জানিয়েছেন, তা কার্যকর করার লক্ষ্যে তারা এখন সামরিক প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের পার্লামেন্টারি কমিটিতে একটি খসড়া আইন অনুমোদনের কয়েক দিন পর এই বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। আইনটিতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি বা যাতায়াত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবনা অনুযায়ী, যাতায়াত শুল্ক ইরানের জাতীয় মুদ্রায় পরিশোধ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজ চলাচলের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারির প্রস্তাবও রাখা হয়েছে খসড়া আইনে। সেইসঙ্গে যেসব দেশ ইরানের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে, তাদের ওপরও বিধি-নিষেধ আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া, নতুন পরিকল্পনায় প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌমত্ব, সশস্ত্র বাহিনীর কর্তৃত্ব, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, পরিবেশগত বিষয় এবং ওমানের সঙ্গে আইনি সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রসঙ্গত, আরব সাগর এবং পারস্য উপসাগরকে যুক্ত করা হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ রুট। প্রতিদিন বিশ্বে যত তেল ও তরল গ্যাসবাহী জাহাজ চলাচল করে, সেসবের ২০ শতাংশই এই রুট ব্যবহার করে।
হরমুজ প্রণালিকে ‘জ্বালানির বৈশ্বিক দরজা’ও বলা হয়, কারণ মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এই পথ ব্যবহার করেই তাদের তেল রপ্তানি করে। হরমুজ না থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সহজে পশ্চিমা বিশ্বে সরবরাহ করা যেত না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ জারি করে ইরান। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ঘোষণা দেয়— হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদেশগুলোর জাহাজ চলাচল করলে সেসব জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গুরুত্বপূর্ণ এ বাণিজ্যপথে ১২টিরও বেশি জাহাজে ইরান হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপত্তা বিষয়ক সংস্থা।
নিরাপত্তা সংকটের কারণে স্বাভাবিকভাবেই হরমুজ দিয়ে এখন জাহাজ চলাচল কমে গেছে এবং তার প্রভাবে বাজারে বাড়ছে জ্বালানি তেল-গ্যাসের দাম। ফলে, ট্রাম্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর চাপও বাড়ছে ক্রমশ।
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম






















