নারী সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যম খাতে জেন্ডার-সংবেদনশীল সংস্কারের মাধ্যমে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আজ ঢাকায় “সমতা” শীর্ষক প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে।
অধিকারভিত্তিক অ্যাডভোকেসি সংস্থা ‘ভয়েস’ কর্তৃক সোমবার ওয়াইডব্লিউসিএ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী, মানবাধিকার কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিবেশে নারী সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বক্তারা ডিজিটাল ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে একটি সামষ্টিক অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং এর জন্য সরকার ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মুহাম্মদ হিরুজ্জামান, এনডিসি। তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণমাধ্যম গঠনে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “সবার জন্য, বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের জন্য একটি নিরাপদ ও ন্যায়সঙ্গত গণমাধ্যম পরিবেশ নিশ্চিত করা একটি যৌথ দায়িত্ব, যার জন্য টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও সহযোগিতা প্রয়োজন এবং সরকার এই ক্ষেত্রে বদ্ধপরিকর।”
প্রকল্পটি ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের তত্ত্বাবধানে এবং ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রাম ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অফ কমিউনিকেশন (IPDC)-এর সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন,ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের প্রধান ও বাংলাদেশের প্রতিনিধি ড. সুজান ভাইজ।
ড. সুজান ভাইজ তার উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, “একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতা এবং নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি। জেন্ডার সমতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে একটি পরিবর্তনশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।” তিনি আরও যোগ করেন, “নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল সুরক্ষার বিষয় নয়, এটি নির্ভরযোগ্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংবাদিকতার পূর্বশর্ত। আমাদের কেবল প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও শাসন কাঠামোর মধ্যে জেন্ডার সমতাকে গেঁথে দিতে সুনির্দিষ্ট ও পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনতে হবে।”
ভয়েস-এর নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “সমতা প্রকল্পের মাধ্যমে আমাদের লক্ষ্য হলো গণমাধ্যম হাউজগুলোর ভেতরে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন আনা। দায়বদ্ধতা কেবল একটি ধারণা নয়, এটি একটি চর্চিত বাস্তবতা হতে হবে যাতে নারী সাংবাদিকরা কোনো পদ্ধতিগত বাধা ছাড়াই গণতান্ত্রিক আলোচনায় অবদান রাখতে পারেন।”
অনুষ্ঠানে “গণমাধ্যমে জেন্ডার সমতা ও নিরাপত্তা ত্বরান্বিতকরণ” শীর্ষক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এমআরডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ডের ওপর জোর দিয়ে বলেন, “গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে হবে। এখন সময় এসেছে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবিক নীতিমালা গ্রহণ করার, যাতে নারীরা কোনো ভয়ভীতি বা বৈষম্য ছাড়াই কাজ করতে পারেন।”
মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, ডিজিটালি রাইট লিমিটেড-এর নির্বাহী পরিচালক, মিডিয়া কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার নীতির বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতা তুলে ধরে বলেন, “মিডিয়ায় জেন্ডার নীতি মিডিয়া পেশাজীবীদের দ্বারাই প্রণীত ও মালিকানাধীন হওয়া উচিত এবং তা কর্মক্ষেত্রের প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হবে। সবার জন্য একক কোনো পদ্ধতি কার্যকর নয়।”
বহ্নিশিখার প্রকল্প পরিচালক সামিনা ইয়াসমিন বলেন, “সমতা প্রকল্প গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা এবং টেকসই সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। নারীদের এই পেশায় উৎকর্ষ সাধনের জন্য আমাদের একটি প্রকৃত নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”
সমাপনী বক্তব্যে ভয়েস-এর উপ-পরিচালক মুশাররাত মাহেরা প্রকল্পের কৌশলগত দিকগুলো তুলে ধরেন। তিনি জানান, “বাংলাদেশে সাংবাদিকতার জনশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ ১০ শতাংশেরও কম, এবং তাদের অনেক চ্যালেঞ্জই অগোচরে থেকে যায়। সমতা প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ জেন্ডার নীতিমালা তৈরি এবং একটি কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়েছি।”
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম





















