শনিবার, ২২ জুন, ২০২৪

ভারতে মোদী ম্যাজিকে ধস

ভারতে মোদী ম্যাজিকে ধস

❏ বিজেপির ভাগ্য এবার নাইডু-নীতীশের হাতে ❏ ভারতে লোকসভা নির্বাচন ❏ ভাই-বোনের হাত ধরেই চমক কংগ্রেসের ❏ গত দুইবারের চেয়ে কম ভোট পেয়েছেন মোদি ❏ সোনিয়ার জয়ের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেন রাহুল

ভারতে সবচেয়ে বড় নির্বাচনের ফল আসছে। আর তাতে দেশটিতে একদলীয় শাসনের ইতি হতে চলারই আভাস মিলেছে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত ভোটগণনার ফলে। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিজেপি একক ভাবে এগিয়ে আছে ২৪১ আসনে। আর বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ‘ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স’ (এনডিএ) এগিয়ে ২৯৬ আসনে। ওদিকে, ইন্ডিয়া জোট এগিয়ে ২২৮ আসনে। কংগ্রেস একক ভাবে এগিয়ে ১০০ আসনে। ভারতে কোনো দল যদি এককভাবে সরকার গঠন করতে চায় তাহলে তাদের ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ২৭২টি আসনে জয় পেতে হবে। তবে মোদির বিজেপি এককভাবে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে তাদের এখন সরকার গঠন করতে হবে এনডিএ জোটে থাকা অন্যান্য দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে। গত নির্বাচনেও বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু সেবার বিজেপি একাই ৩০২টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। ফলে তারা চাইলে জোট ছাড়াই সরকার গঠন করতে পারত। কিন্তু এবার তাদের আর সেই সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা পর্যন্ত ঘোষিত ২৫৪টি আসনের মধ্যে দেখা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন দল বিজেপি পেয়েছে ১২৬টি আসন। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল রাহুল গান্ধীর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস পেয়েছে ৫৪টি আসন। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৮টি আসন পেয়েছে সমাজবাদী দল। আর বাকি আসনগুলো পেয়েছে অন্যান্য দলগুলো।

এদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টানা তৃতীয়বারের মতো উত্তর প্রদেশের বারণসি থেকে লোকসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। মঙ্গলবার নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করে দেশটির নির্বাচন কমিশন।

প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, মোদি বারাণসিতে ৬ লাখ ১২ হাজার ৯৭০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এই আসনে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী অজয় রায় (কংগ্রেস) পেয়েছেন ৪ লাখ ৬০ হাজার ৪৫৭ ভোট। অর্থাৎ মোদি মাত্র ১ লাখ ৫২ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। মোদি বারণসির এই আসনে মোট ভোটের ৫৪ দশমিক ২৪ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। অপরদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী অজয় রায় পেয়েছেন ৪০ দশমিক ৭৪ শতাংশ ভোট।

কমেছে মোদির ভোট: মোদি তৃতীয়বারের মতো জয় পেলেও ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের তুলনায় তার ভোটের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সমাজবাদী দলের সালিনী জাদবকে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৫ ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন। সেবার মোদি ভোট পেয়েছিলেন ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৬৬৪টি। অপরদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সালিনী পেয়েছিলেন মাত্র ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৫৯ ভোট। মোদি ২০১৯ সালে মোট ভোটের ৬৩ দশমিক ৬২ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন। সেখানে এ বছর এটি ৫৪ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে।

অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে বিজেপির প্রধান টার্গেট ছিল রাহুল গান্ধী। পাপ্পু ও শাহজাদা বলেও ডাকা হতো তাকে। মূলত গান্ধী পরিবার ছিল বিজেপি নেতাদের মূল টার্গেট। গত এক দশক ধরে বিজেপির তীব্র সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে তাদের। কিন্তু ২০১৪ ও ২০১৮ সালের তুলনায় এবারে দৃশ্যপট ভিন্ন। শতাধিক আসনে এগিয়ে থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কংগ্রেস। তাদের নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে রয়েছে ২৩০ আসনে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। এবারের নির্বাচনে বিজেপির চেয়ে অর্ধেক আসন পেয়ে মিশন শেষ করতে পারে কংগ্রেস। তবে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে দুই ভাই-বোনের অবদান।

এছাড়া ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলি বরাবরই কংগ্রেসের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এ নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। এ আসনে বিপুল ভোট পেয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, যা ছাড়িয়ে গেছে তার মা সোনিয়া গান্ধীর ২০১৯ সালের ভোট জয়ের রেকর্ড।

এনডিটিভি জানায়, ভারতের নির্বাচন কমিশনের দুপুর ৩টা ১৫ মিনিটে দেয়া ভোটের ফল অনুযায়ী, ৩ লাখেরও বেশি ভোট পেয়েছেন রাহুল গান্ধী। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) দীনেশ প্রতাপ সিং। তার থেকে এখন পর্যন্ত ২ দশমিক ৬২ লাখের বেশি ভোটে এগিয়ে আছেন রাহুল, যা সবশেষ ২০১৯ নির্বাচনে এ আসন থেকে তার মা সোনিয়া গান্ধীর চেয়েও বেশি ভোটের ব্যবধান। ২০০৪ সাল থেকে এ আসন ধরে রেখেছিলেন সোনিয়া গান্ধী। ২০১৯ সালের নির্বাচনে তিনি প্রতাপ সিংয়ের বিপক্ষে ১ দশমিক ৬৭ লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। তবে এবার এই আসনে লড়েননি সোনিয়া। রায়বরেলির গত কয়েকবারের সাংসদ সনিয়া গান্ধী এবার এই আসন ছেড়ে রাজ্যসভায় যাওয়ায় এখানে প্রার্থী হন তার ছেলে রাহুল গান্ধী।

এবার বিজেপি এবার তাদের জন্য ৩৭০ আসন আর এনডিএ জোটের জন্য ৪০০ আসনের লক্ষ্য র্নিধারণ করেছিল। কিন্তু ভোটের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের নির্বাচনী ফলের বিপরীতে এবার মোদীর দল বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে পারেনি।

ফলে এবার আর সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না দলটি। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কেন্দ্রে সরকার গড়ার জন্য মোদীকে নির্ভর করতে হবে জোট এনডিএ-র দুই শরিক, চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলুগু দেশম পার্টি (টিডিপি) এবং নীতীশ কুমারের জেডিইউ এর ওপর।

নীতীশের নেতৃত্বাধীন জনতা দল (ইউনাইটেড) ১৪টি আসন পাবে এবং নাইডুর তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিপি) ১৬ আসন পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতীতে এ দুইদলের নেতারই একাধিক বার এনডিএ ত্যাগ এবং ফিরে আসার ইতিহাস রয়েছে। এবার তারা কী করেন সেদিকেই নজর সবার।

সমর্থন ছাড়া বিজেপির পক্ষে কেন্দ্রে সরকার গড়া সম্ভব নয়, সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। আর এতেই দুই নেতার রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে গেছে। আর তারা সত্যিই শেষ পর্যন্ত বিজেপি-কে সমর্থন করেন, নাকি আবারও ভোল পাল্টান তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) বলছে, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার এবং টিডিপি’র চন্দ্রবাবু নাইডু এবার মোদীর এনডিএ জোটকে বাদ দিয়ে বিরোধীপক্ষের সঙ্গে যোগ দিতে পারে।

এবারের লোকসভা নির্বাচনেই জেডিইউ ও টিডিপি দুটি দলই বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের অংশ হিসেবে ভোটে লড়লেও নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর এ দুই দল যে বিজেপিকে সমর্থন করতে বাধ্য থাকবে তা নয়। কিন্তু সরকার গড়ার চাবিকাঠি যে চন্দ্রবাবু নাইডু ও নীতিশ কুমারের হাতেই থাকছে সেটি সন্দেহাতীত।

ভোটের এই ফলাফলেমোদীরটানা তৃতীয়বারের মতপ্রধানমন্ত্রী হওয়া অনেকটা নিশ্চিত হয়ে গেলেওজওহরলাল নেহরুর মতপরপর তিনবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসাররেকর্ড তিনি ছুঁতে পারলেন না।

ভোটের ফলে যে চিত্র দেখা যাচ্ছে তাতে এনডিএ জোট খুব একটা স্বস্তিতে নেই। এ পরিস্থিতিতে ইন্ডিয়া জোট শরিক বাড়ানোর চেষ্টা নিতে চাইছে। আর জোট ধরে রেখে সরকার গড়তে এরই মধ্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিজেপি শিবির। তাই বুধবারই শরিক দলগুলো সঙ্গে এনডিএ জোট বৈঠকে বসতে চলেছে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি। ইতিমধ্যে টিডিপি নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু এবং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী তথা জেডি(ইউ) নেতা নীতিশ কুমারের সঙ্গে খোদ অমিত শাহ কথা বলেছেন।

ইতোমধ্যে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নাড্ডা নিজের বাসভবনে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকেও বসেছেন। অমিত শাহ, রাজনাথ সিংও সেই বৈঠকে যোগ দিয়েছেন। সবমিলিয়ে, এখন থেকেই ঘর গোছাতে শুরু করে দিয়েছে বিজেপি।

বসে নেই ইন্ডিয়া জোটও। ইন্ডিয়া জোট ২০০-র বেশি আসনে এগোনোর পর থেকেই ঘর গোছাতে শুরু করে দিয়েছে কংগ্রেস শিবির। এই জোট গড়ার শুরুতে নীতীশ কুমার প্রধান ভূমিকা নিলেও পরবর্তীতে দলবদল করে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। তবে সেকথা ভুলে নীতীশ কুমারের সঙ্গে কথা বলেছে কংগ্রেস। তাছাড়া জোট শরিক না হলেও সরকার গঠনে বড় ফ্যাক্টর হতে চলা চন্দ্রবাবু নাইডুর সঙ্গেও কথা বলেছে কংগ্রেস। এই লোকসভা নির্বাচনে সংসদে বিরোধী দলের মর্যাদা ফিরে পেতে পারে কংগ্রেস। বিরোধী দলনেতার পদের জন্য লোকসভায় ৫৫টি আসনে জেতা প্রয়োজন। এ বার ভোটগণনার প্রবণতা বলছে, ‘ইন্ডিয়া’র সব সহযোগী দল মিলে দু’শোর গণ্ডি টপকাতে চলেছে। ফলে লোকসভার অধিবেশনেও এ বার বিরোধীদের কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে মোদীকে।

সম্পাদক : জোবায়ের আহমেদ নবীন