শনিবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২৬

দিপু হত্যা: বাবার অপেক্ষায় শিশুসন্তান, বাকরুদ্ধ মা ও স্ত্রী

দিপু হত্যা: বাবার অপেক্ষায় শিশুসন্তান, বাকরুদ্ধ মা ও স্ত্রী

ভালুকায় পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে (২৮) পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় এখনও শোকে স্তব্ধ ময়মনসিংহের তারাকান্দার মোকামিয়া কান্দা। মোকামিয়া কান্দা দিপুর গ্রামের বাড়ি। সেখানেই বাস করে দিপুর পরিবার। ছেলে হারানোর আকস্মিকতায় শোকে পাথর মা শেফালি রবি দাস, বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন স্ত্রী মেঘনা রবি দাস। আর দেড় বছরের শিশুসন্তান রিতিকা রবি দাসের নিষ্পাপ চোখ বাবাকে খুঁজে ফিরছে। সে অপেক্ষায় আছে বাবা কখন ঘরে ফিরবে, তাকে পরম মমতায় বুকে জড়িয়ে কপালে চুমু দেবে। তবে সে এখনও বুঝতে শিখেনি যে, বাবা অনন্তকালের পাড়ি দিয়েছেন, আর কখনও ফিরবেন না।


ময়মনসিংহ সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে মোকামিয়া কান্দা গ্রাম। তারাকান্দা বাসস্ট্যান্ড থেকে উত্তর দিকে ১০ মিনিট হাঁটলে কলেজ গেটের সরকারি খাদ্যগুদাম। ৫ মিনিট হাঁটলে দিপু দাসের বাড়ি। দিপু দাসের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, কয়েক বিঘা ফসলি জমির একটি মাঠের মধ্যে বেশ কয়েকটি টিনের ছাপরা। সেখানে সনাতন ধর্মের কয়েক ঘর লোকের বাস। তার মধ্যে পূর্ব-পশ্চিমমুখী ঘরটিতে দিপু দাসের পরিবারের বসবাস। ছোট এই ঘরটিতে সাত জন থাকেন।


বাড়ির উঠানে গিয়ে দেখা যায় দিপু দাসের মা শেফালি ও কয়েকজন রোদ পোহাচ্ছেন। তার বাবা একটি পাটি বিছিয়ে মেঝেতে শুয়ে আছেন। কথা হয় তার মায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অন্যায়ভাবে আমার ছেলেকে মারা হয়েছে। তার নামে যে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে হত্যা করেছে—তার বিচার ভগবান করবেন। দিপু আমার বড় ছেলে। সংসার দেখার আর কেউ রইলো না। আমরা এখন কীভাবে বাঁচবো। আমাদেরও মেরে ফেলেন’—বলেই শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মোছেন এই নারী।


কাঁদতে কাঁদতে শেফালী বলেন, ‘মারা যাওয়ার আগের দিন রাতে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল- মা ঘরে কী বাজার আছে। আমি বলেছিলাম চাল ও তেল আনতে হবে। বাবার সঙ্গে আর কোনও কথা হয় নাই।’



একই অবস্থা দিপুর স্ত্রী মেঘনার। ঘরে এক কোণে শিশুসন্তানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করতেই হাউমাউ করে কেঁদে দেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘দিপুর সঙ্গে কারও গন্ডগোল ছিল না। দিপু গন্ডগোল করার ছেলে না। কে নেবে আমার শিশুসন্তানের দায়িত্ব। আমি স্বামী হত্যার বিচার চাই।’


মেঘনার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তার বাবা বাবুরাম দাস (গ্রাম পুলিশ)। হত্যার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দিপু দাস ডিগ্রি পাস, ভালো কাজও করে। কয়েক দিন আগে দিপু সুপারভাইজার থেকে ম্যানেজার পদোন্নতি পায়। বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি মো. এরশাদ ও নিবির ইসলাম অনিক। তারা বলতে শুরু করে- হিন্দু, ছোট জাতের ছেলেকে স্যার বলতে হবে, এটা মানা যায় না।’


তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে ঘটনার দিন অনিক ও এরশাদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে এরশাদের নেতৃত্বে অনিক তার দলবল নিয়ে দিপুকে মারতে মারতে কারখানা থেকে বাইরে নিয়ে যায়। মারা গেছে বুঝতে পেরে গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর মিথ্যা গুজব রটায় যে মহানবী ও ধর্ম নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছে।’


কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবুরাম বলেন, অল্প বয়সে সিঁথির সিঁদুর মুছে গেলো, শিশুসন্তান নিয়ে বিধবা হলো। মেয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারি না’ বলেই কানায় ভেঙে পড়েন তিনি।


পাশেই দাঁড়িয়ে দিপু দাসের বাবা রবি লাল রবি দাস ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। বলেন, ‘যারা দিপুকে হত্যা করেছে, ভগবান যেন তাদের বিচার করে।’


গ্রামের মানুষ ও ইউএনও যা জানালেন


মোকামিয়া কান্দা গ্রামের বাসিন্দা তাপসি ভৌমিক  বলেন, ‘দিপুর শৈশব-কৈশোর এই গ্রামের কেটেছে। তালদিঘি হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও বঙ্গবন্ধু কলেজ থেকে এইচএসসি পাস পরে। পরে বিএ পাসও করে।’


তিনি বলেন, ‘শুনেছি কারখানার লোকদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হলে তাকে হত্যা করা হয়। দিপু শান্ত ও নিরীহ ছেলে। আমার গ্রামের মানুষ এই হত্যার বিচার চাই।’


একই গ্রামের বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে পড়াতো দিপু। কখনও এই গ্রামের কারও সঙ্গে তার কোনও ঝগড়া হয়নি। সে কারও সঙ্গে কোনও ঝামেলা করেছে—এমন দেখিনি।’


তারাকান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি অনুদান হিসেবে জেলা প্রশাসক দিপুর পরিবারকে একটি ২৫ হাজার চেক দিয়েছে। এছাড়া উপজেলা থেকে ৫ প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী (চাল, ডাল, তেলসহ অন্যান্য) দেওয়া হয়েছে।’


তিনি বলেন, ‘এছাড়া দিপুর স্ত্রীকে একটি ঘর তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেখানে টয়লেট ও রান্নাঘরও থাকবে। এছাড়া একটি বিধবা কার্ড দেওয়া হবে। দিপুর বাবাকেও একটি প্রতিবন্ধী কার্ডও দেওয়া হবে। এছাড়া দিপুর স্ত্রীকে একটি সরকারি চাকরির দেওয়া চেষ্টা করা হচ্ছে।’

সম্পাদক : অপূর্ব আহমেদ