আশঙ্কাজনক হারে বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছে মাগুরার শালিখায়। মাত্র এক বছরেই এই এক উপজেলাতে মোট ৫৮১টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে।
শালিখা উপজেলার মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অধিকাংশ তালাকের নোটিশ আসছে নারীদের পক্ষ থেকে। তালাকপ্রাপ্ত নারীদের বয়স সাধারণত ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শালিখা উপজেলার সাত ইউনিয়নে মোট ৫৮১টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে তালখড়ি ইউনিয়নে ১৪৪টি, শতখালী ইউনিয়নে ১২২টি, গঙ্গারামপুর ইউনিয়নে ২৪টি, আড়পাড়া ইউনিয়নে ১০৪টি, বুনাগাতী ইউনিয়নে ৬৪টি, শালিখা ইউনিয়নে ৭৯টি ও ধনেশ্বরগাতী ইউনিয়নে ৪৪টি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটেছে এই এক বছরে। একই সময়ে সেখানে সম্পন্ন হয়েছে ১ হাজার ৪২টি বিবাহ।
এর আগের বছর; অর্থাৎ ২০২৪ সালেও এই এক উপজেলায় ঘটেছে ৫ শতাধিক বিবাহ বিচ্ছেদ। শালিখার সাত ইউনিয়নে মোট ৫১১টি তালাকের ঘটনা ঘটেছিল ওই বছর, যেখানে নিকাহ সম্পন্ন হয়েছিল ৮৫২টি। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪৮টি বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে শালিখায়।
২০২৫ সালের তালাকের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছেলে পক্ষ থেকে তালাক হয়েছে ৩৮টি, উভয় পক্ষের সম্মতিতে মিউচুয়াল তালাক হয়েছে ১৯৩টি এবং নারী পক্ষ থেকে ‘ডি’ তালাক হয়েছে ৩৪৮টি, যা পুরুষ পক্ষের তুলনায় প্রায় নয় গুণ বেশি। তালাকের সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে তালখড়ি ইউনিয়ন, আর সবচেয়ে কম বিচ্ছেদ ঘটেছে গঙ্গারামপুর ইউনিয়নে।
শালিখার আড়পাড়া ইউনিয়নের মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার রোকনুজ্জামান বলেন, অধিকাংশ বিবাহ বিচ্ছেদের পেছনে রয়েছে পরকীয়া সম্পর্ক। এ ছাড়া পারিবারিক বনিবনার অভাব, স্বামীর দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা, সামাজিক অবক্ষয়সহ নানা কারণও দায়ী।
এ বিষয়ে শালিখা উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা আব্দুল আওয়াল (অতি. দা.) বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদ রোধে আমরা মাঝে মাঝে উঠান বৈঠক করে থাকি। তবে, এসব বিষয় মূলত ইউনিয়ন পরিষদের আওতাভুক্ত।
তালাক বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে শালিখা উপজেলা কোর্ট মসজিদের খতিব মুফতি মোশারফ হোসেন কাসেমী বলেন, ইসলাম নিয়ে অজ্ঞতা, পরকীয়া, পারস্পরিক ভুল-বোঝাবুঝি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাবের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়ছে। এর ফলে, সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি মানুষের মানসিক চাপও বেড়ে যাচ্ছে।
বিবাহ বিচ্ছেদের এই ঊর্ধ্বগতি শালিখা উপজেলার সামাজিক কাঠামোর জন্য একটি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সচেতন মহলের মতে, পরিবার ভেঙে গেলে তার প্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে সামাজিক স্থিতিশীলতা, নৈতিকতা ও পারিবারিক বন্ধন মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। বিবাহ বিচ্ছেদ রোধে পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ জোরদার করা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
বিশেষ প্রতিনিধি | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























