প্রায় দুই শতাব্দীর সাক্ষী নওগাঁর ঐতিহাসিক ধামইরহাট আলতাদিঘি শালবন। ২৬৪ হেক্টরের এই বনে বন্যপ্রাণী আর সবুজের মিতালির চেয়েও এখন দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে বিশালাকার মাটির ঢিবি। কোনোটি ৫ ফুট, আবার কোনোটি প্রায় ১১ ফুট উঁচু। বনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৩৫টি এমন দৃষ্টিনন্দন ঢিবি আসলে মানুষের কোনো কারুকাজ নয়, বরং লাখ লাখ উইপোকার যৌথ পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এক আশ্চর্য প্রাকৃতিক স্থাপত্য।
সবুজের এই রাজ্যে প্রবেশ করে আঁকাবাঁকা পিচঢালা পথ ধরে কিছুদূর এগোতেই চোখ আটকে যায় মাটির তৈরি কিছু বিশাল বিশাল ঢিবিতে। প্রথম দেখায় মনে হবে, যেন কোনো শিল্পী নিখুঁত হাতে বনজুড়ে গড়ে তুলেছেন অসাধারণ ভাস্কর্য। কিন্তু বাস্তবে এগুলো প্রকৃতির বিস্ময় উইপোকার তৈরি বাসা, যা দেখতে যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রাসাদ।
বনের মৃত গাছের গোড়াকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে লাখো উইপোকার নিরলস শ্রমে গড়ে উঠেছে এসব স্থাপনা। অধিকাংশ ঢিবির উচ্চতা পাঁচ থেকে ছয় ফুট হলেও, সবচেয়ে বড়টির উচ্চতা প্রায় ১১ ফুট। বিশাল এই ঢিবিটি গুলো সংরক্ষণের জন্য বন বিভাগ চারপাশে বেষ্টনীও নির্মাণ করেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, শালবনের বুকেই যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কোনো প্রাচীন দুর্গ বা পিরামিড। পুরো বনজুড়ে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ৩৫টি এমন উইঢিবি।
স্থানীয় বাসিন্দা সাকলাইন কবির বলেন, শৈশব থেকেই এই শালবনের সঙ্গে আমার বেড়ে ওঠা। বনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গাছপালা, পাখি, বানর, সাপসহ নানা বন্যপ্রাণীর সঙ্গে আমার রয়েছে গভীর আত্মিক সম্পর্ক। সুযোগ পেলেই বনের ভেতরে ঘুরতে আসি।
তিনি বলেন, এই বিশাল উইঢিবিটি সাত-আট বছর আগেও এত বড় ছিল না। ধীরে ধীরে এটি বর্তমান আকার ধারণ করেছে। শালবনে আরও অনেক ঢিবি রয়েছে, তবে এটিই সবচেয়ে বড়। লাখ লাখ উইপোকার যৌথ পরিশ্রমে তৈরি এই স্থাপনায় এখন বনের অন্যতম আকর্ষণ।
বদলগাছী থেকে স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন মিঠু হাসান। বিশাল উইঢিবির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে তুলতে তিনি বলেন, বাসাবাড়িতে ছোট ছোট উইঢিবি দেখেছি, কিন্তু এত বড় কখনো দেখিনি। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো মানুষ এটি তৈরি করেছে। পরে জানতে পারলাম, এটি পুরোপুরি উইপোকার সৃষ্টি। সত্যিই অবিশ্বাস্য। দেখতে অনেকটা পিরামিডের মতো। তাই স্মৃতি হিসেবে ছবি তুলতেই হলো।
ধামইরহাট বন বিট কর্মকর্তা আনিছুর রহমান জানান, প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী শালবনে আসেন এবং তাদের অন্যতম আকর্ষণ এই উইঢিবিগুলো। যাতে কোনোভাবে এগুলোর ক্ষতি না হয়, সে জন্য নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি বলেন, শালবনের শুরু থেকেই এখানে উইপোকার বসবাস। সময়ের সঙ্গে কিছু ঢিবি বিলীন হয়েছে, আবার নতুন ঢিবিও তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় ঢিবিটি নির্মাণে প্রায় ১২ লাখের মতো উইপোকা কাজ করেছে বলে আমাদের ধারণা। এত বড় আকারের উই ঢিবি আমি অন্য কোনো শালবনে দেখিনি।
স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, আলতাদিঘি শালবনের এই বিশাল উইঢিবিগুলো শুধু প্রকৃতির বিস্ময় নয়, বরং বনজ পরিবেশের সুস্থতা ও জীববৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তাই এই অনন্য প্রাকৃতিক স্থাপত্য সংরক্ষণে দর্শনার্থীদের যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনি বন বিভাগেরও নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কথা হলে নওগাঁ সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওয়াহেদ আলী বলেন, উইপোকা মাটির নিচ থেকে পুষ্টি ও আর্দ্রতা সংগ্রহের জন্য ঢিবির ভেতরে অসংখ্য ক্ষুদ্র ছিদ্র ও সুচারু পথ তৈরি করে। এসব অংশকে এক অর্থে তাদের খাদ্যসংগ্রহের কক্ষ বলা যায়।
বিশেষ প্রতিনিধি | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























