কেয়ামত বা শেষ দিবস ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিশ্বাস। এর সুনির্দিষ্ট সময় একমাত্র মহান আল্লাহই জানেন। তবে কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী, কেয়ামতের আগে পৃথিবীতে নানা নৈতিক, সামাজিক ও মহাজাগতিক পরিবর্তন ঘটবে, যা ইসলামি পরিভাষায় ‘আশরাতুস সাআ’ বা কেয়ামতের নিদর্শন নামে পরিচিত। এই পরিবর্তনগুলো মূলত মানবজাতিকে এক আসন্ন মহাজাগতিক মহাপ্রলয়ের ব্যাপারে সতর্ক করে।
কেয়ামতের আগে পৃথিবীর প্রধান রূপান্তরসমূহ
নিচে কোরআন ও হাদিসের বর্ণনার আলোকে কেয়ামতের আগের সেই সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করা হলো-
১. নৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন (ছোট আলামত)
কেয়ামতের আগে মানুষের চরিত্রে আমূল বিপর্যয় দেখা দেবে এবং দীর্ঘদিনের প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধগুলো সংকুচিত হয়ে আসবে। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী-
নেতৃত্ব ও আমানতদারিতা: সমাজের অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে ক্ষমতা ও নেতৃত্ব অর্পণ করা হবে এবং আমানতদারিতা পুরোপুরি হারিয়ে যাবে। (সহিহ বুখারি)
অপরাধের বিস্তার: ব্যভিচার, মাদক এবং অশ্লীলতা সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করবে। মানুষ হত্যা বা ‘হারজ’ এত বৃদ্ধি পাবে যে, হত্যাকারী জানবে না সে কেন হত্যা করছে।
পারিবারিক শৃঙ্খলা: সন্তানরা পিতামাতার অবাধ্য হবে এবং তাদের সাথে দাসের মতো আচরণ করবে। হাদিসের ভাষায়- ‘দাসী তার মনিবকে প্রসব করবে।’ (সহিহ মুসলিম)
সুউচ্চ অট্টালিকার প্রতিযোগিতা: নিঃস্ব ও রাখাল শ্রেণির মানুষরা সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণে একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। (সহিহ মুসলিম: ৮)
২. প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক রূপান্তর
কেয়ামতের আগে পৃথিবীর ভূ-প্রকৃতিতে আশ্চর্যজনক কিছু পরিবর্তন দেখা দেবে।
আরব উপদ্বীপের পরিবর্তন: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, আরবের মরুভূমিগুলো নদ-নদী এবং সবুজ শ্যামল বনরাজিতে ভরে না যাওয়া পর্যন্ত কেয়ামত হবে না। (সহিহ মুসলিম)। মরুভূমিতে সবুজের ছোঁয়া অনেকের কাছে এই পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত।
ফোরাত নদীর রহস্য: হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, ইরাকের ফোরাত (ইউফ্রেটিস) নদী শুকিয়ে যাবে এবং সেখান থেকে স্বর্ণের একটি পাহাড় উন্মোচিত হবে।
প্রাকৃতিক বিপর্যয়: ভূমিকম্পের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাবে এবং পূর্ব, পশ্চিম ও আরব উপদ্বীপে তিনটি বড় ধরনের ভূমিধস হবে। (সহিহ মুসলিম: ২৯০১)
৩. সময় ও জড় পদার্থের ভাষ্য
হাদিসে বর্ণিত কিছু আলামত বর্তমান সময়ের আধুনিক জীবনধারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে ইসলামি চিন্তাবিদগণ মনে করেন-
সময়ের সংকোচন: কেয়ামতের আগে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। একটি বছর একটি মাসের মতো এবং একটি মাস একটি সপ্তাহের মতো মনে হবে। (তিরমিজি)
জড় পদার্থের কথা বলা: রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘ততক্ষণ কেয়ামত হবে না, যতক্ষণ না মানুষের চাবুক ও তার জুতার ফিতা তার সাথে কথা বলবে।’ (তিরমিজি) কিছু সমকালীন গবেষক একে আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, তবে এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে।
৪. মহাপ্রলয়ের ১০টি বড় নিদর্শন (বড় আলামত)
কেয়ামত যখন অতি সন্নিকটে আসবে, তখন ধারাবাহিকভাবে ১০টি বড় নিদর্শন প্রকাশিত হতে থাকবে। হাদিস বিশারদদের মতে, এগুলো সুতোয় গাঁথা দানার মালার মতো একটির পর একটি দ্রুত ঘটতে থাকবে-
১. ইমাম মাহদির আগমন: তিনি মুসলিম উম্মাহর নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে পৃথিবীতে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন।
২. দাজ্জালের আত্মপ্রকাশ: পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ফেতনা হবে দাজ্জালের আবির্ভাব।
৩. হজরত ঈসা (আ.)-এর অবতরণ: তিনি দামেস্কের সাদা মিনারের ওপর অবতীর্ণ হয়ে দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং পৃথিবীতে শান্তি কায়েম করবেন। (সুরা জুখরুফ: ৬১)
৪. ইয়াজুজ-মাজুজের মুক্তি: এক বিশাল মানবগোষ্ঠী পাহাড়ের দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে এসে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। (সুরা আম্বিয়া: ৯৬)
৫. পশ্চিম আকাশে সূর্যোদয়: সূর্যের উদয়স্থল পরিবর্তন হবে। পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়ার সাথে সাথে তওবার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। (সহিহ মুসলিম)
৬. দাব্বাতুল আরদ: মাটি থেকে এক অদ্ভুত প্রাণী বের হবে যা মানুষের সাথে কথা বলবে। (সুরা নমল: ৮২)
৭. ধোঁয়া (দুখান): আকাশ থেকে একটি ঘন ধোঁয়া সারা পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করবে।
৮, ৯ ও ১০: তিনটি বড় ভূমিধস এবং ইয়েমেনের আগুন: সর্বশেষ ইয়েমেন থেকে একটি বিশাল আগুন বের হবে যা মানুষকে হাশরের ময়দানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।
৫. চূড়ান্ত মহাপ্রলয় ও পৃথিবীর ধ্বংস
হাদিস ও কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, সিঙ্গায় ফুৎকারের মাধ্যমে পৃথিবীর শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে যাবে। আসমান-জমিন ও গ্রহ-নক্ষত্র কক্ষচ্যুত হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘পৃথিবী যখন আপন কম্পনে প্রচণ্ড রকম প্রকম্পিত হবে... মানুষ বলবে, এর কী হলো?’ (সুরা জিলজাল: ১-৩)
কেয়ামতের এই আলামতগুলো মানবজাতির জন্য এক জোরালো সতর্কবার্তা। পৃথিবীর জীবনের সীমাবদ্ধতা ও ভঙ্গুরতা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই নিদর্শনগুলো মানুষকে আত্মশুদ্ধি এবং পরকালের প্রস্তুতির দিকে আহ্বান জানায়। বর্তমান সময়ের সামাজিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক পরিবর্তনগুলো অনেকের কাছে এই নিদর্শনগুলোর সম্ভাব্য প্রতিফলন হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। পৃথিবী যে এক অনিবার্য চূড়ান্ত পরিণতির দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে- এই উপলব্ধিই একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম
























