বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২৬

ছোট গল্প: মায়ের হার

ছোট গল্প: মায়ের হার

অধ্যক্ষ মোঃ শিমুল বিল্লাল:

বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তে খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার মালতী গ্রাম। সবুজ বনানীতে আচ্ছাদিত এই শান্ত-সুন্দর গ্রামটির পশ্চিম তীর ঘেঁষে বয়ে চলেছে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতিবিজড়িত কালজয়ী কবিতা 'কপোতাক্ষ নদ'। স্রোতস্বিনী এই নদীর বুক চিরে একসময় চলাচল করত লঞ্চ, স্টিমার, বড় গহনার নৌকা এবং টাবুরে নৌকা। এসব নৌযান শুধু এ অঞ্চলের যোগাযোগের মাধ্যমই ছিল না; বরং কলকাতাসহ দূর-দূরান্তের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য ও আত্মীয়স্বজনের যোগাযোগের অন্যতম ভরসাও ছিল। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাতায়াতের জন্য মানুষ সাধারণত লঞ্চ ও স্টিমার ব্যবহার করত। আর ১৯৫০-এর দশকে সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসা ছিল পায়ে হেঁটে কিংবা গরুর গাড়িতে চলাচল।

এই অঞ্চল থেকে যারা কলকাতা, ঢাকা, খুলনা কিংবা চট্টগ্রামে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতেন, তাঁদের মধ্যে নজমুল হক ছিলেন অন্যতম। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তিনি প্রায়ই কলকাতায় যাতায়াত করতেন। কখনো গহনার নৌকায় এ অঞ্চলের বিভিন্ন কৃষিপণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী কলকাতায় নিয়ে যেতেন। পৈতৃক সম্পত্তির অভাব তাঁর ছিল না; তবুও সংসারের আর্থিক স্বচ্ছলতা আরও বাড়ানোর জন্য তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

নজমুল হক ও শামসুন্নাহার দম্পতির সংসার সুখেই চলছিল। তাঁদের ঘরে প্রথমে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান। নাম রাখা হয় কামরুজ্জামান। বছর দুয়েক পর জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। বাবা-মা, দাদি, ফুফুসহ পরিবারের সকলেই আনন্দে আত্মহারা। ফুটফুটে, মিষ্টি চেহারার সেই কন্যার নাম রাখা হয় রওশনারা, যার অর্থ—আলোকিত করা। তবে পরিবারের সবার আদরের নাম ছিল পারুল—গ্রামবাংলার অতি পরিচিত, স্নেহমাখা একটি নাম।

ছোটবেলা থেকেই পারুল বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন এবং পাড়াপড়শির অত্যন্ত আদরের মেয়ে ছিল। কয়েক বছরের ব্যবধানে তার আরও কয়েকজন ভাই-বোনের জন্ম হয়—বদরুজ্জামান, রশিদুজ্জামান, মনিরুজ্জামান, ওয়াহিদুজ্জামান, লিলি বেগম এবং লাকি বেগম। পরিবারের সদস্যসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নজমুল হকও তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি আরও বিস্তৃত করেন।

কয়েক বছর পর পারুলের বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার বয়স হয়। বাড়ি থেকে প্রায় এক মাইল দূরে আগরঘাটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাকে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। বাড়ির সবার কাছে যেমন সে প্রিয় ছিল, তেমনি অল্পদিনেই শিক্ষকদেরও স্নেহভাজন হয়ে ওঠে। প্রতিবছর পরীক্ষায় তার ফলাফল ছিল অত্যন্ত ভালো। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করে সে একাধিকবার পুরস্কারও অর্জন করে। বিশেষ করে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের 'কবর' কবিতাটি সে অত্যন্ত আবেগঘনভাবে আবৃত্তি করত। পারুলের দাদি নাতনির এই আবৃত্তি শুনে ভীষণ আনন্দ পেতেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই চোখের জল সামলাতে পারতেন না।

এদিকে পরিবারের সদস্যসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসারের দায়িত্বও বেড়ে যায়। মা একা সব সামলাতে হিমশিম খেতেন। ছোটবেলা থেকেই পারুল সংসারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে শুরু করে। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে সে ছোট দুই ভাই বদর ও রশিদের দেখাশোনা করত। তাদের খাওয়ানো, কোলে নেওয়া, ঘুম পাড়ানো—সবকিছুই নিজের হাতে করত। বিশেষ করে ছোট ভাই রশিদ যেন সারাক্ষণ পারুলের কোলেই থাকতে ভালোবাসত। এভাবেই আদর, স্নেহ আর দায়িত্বের মধ্য দিয়ে পারুলের শৈশব কেটে যেতে থাকে।

সময়ের প্রবাহে পারুল বড় হতে থাকে। গ্রামীণ সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি অনুযায়ী তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য বাড়িতে ঘটকের আনাগোনা শুরু হয়। কিন্তু বাবা-মা প্রায় দেড়-দুই বছর ধরে একটিই কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতেন—'মেয়েটা এখনও লেখাপড়া করছে।'

এদিকে নানা কাজে নজমুল হকের বিনোদগঞ্জে যাতায়াত ছিল নিয়মিত। একদিন তিনি খবর পেলেন, কপিলমুনি ইউনিয়ন পরিষদের সভাপতি আব্দুল জব্বার তাঁর বড় ছেলে মান্নানের জন্য উপযুক্ত পাত্রী খুঁজছেন। অনেক মেয়ে দেখাশোনা করা হলেও কোনো না কোনো কারণে বিয়ের বিষয়টি এগোচ্ছিল না। কখনো মেয়ে পছন্দ হলেও পরিবার পছন্দ হতো না, আবার কখনো অন্য কোনো কারণে সম্বন্ধ ভেঙে যেত। অন্যদিকে আব্দুল জব্বারও বড় ছেলের বিয়ে নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন।

একপর্যায়ে তিনি লোকমারফত মালতী গ্রামের নজমুল হকের কাছে প্রস্তাব পাঠান—তাঁর কন্যাকে তিনি নিজের পুত্রবধূ হিসেবে দেখতে চান। বিষয়টি নিয়ে নজমুল হক ও শামসুন্নাহার অনেক ভাবনাচিন্তা করেন। মেয়েকে তো একদিন বিয়ে দিতেই হবে। এদিকে পারুল তখন মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিদ্যালয়ের নির্বাচনী পরীক্ষাও শেষ হয়েছে, আর লেখাপড়ায়ও সে অত্যন্ত মেধাবী। অনেক চিন্তাভাবনার পর দুই পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়—পারুলের সঙ্গে মান্নানের বিবাহ হবে।

দুই পরিবারের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। আত্মীয়স্বজন, শুভানুধ্যায়ী ও পাড়াপড়শিদের নিয়ে ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন করা হয়। বিয়ের দিন পালকিতে চড়ে কয়েক মাইল পথ অতিক্রম করে পারুল শ্বশুরবাড়ি কাশিমনগর গ্রামে আসে।

শ্বশুরবাড়িতে গিয়েও অল্প সময়ের মধ্যেই সে সকলকে আপন করে নেয়। যদিও ছোট ভাই-বোনদের জন্য তার মন প্রায়ই কাঁদত, তবুও নতুন সংসারে নিজের জায়গা করে নিতে তার খুব বেশি সময় লাগেনি। দেবর বুলবুল এবং ননদ খাদিজার সঙ্গে তার ছিল গভীর স্নেহের সম্পর্ক। ধীরে ধীরে তারা আপন ভাই-বোনের মতোই এক আন্তরিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ওঠে।

শ্বশুর আব্দুল জব্বার এবং শাশুড়ি জিন্নাতুন নেছা পারুলকে নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করতেন। বিয়ের পর কয়েক বছর ধরে তাঁরা প্রায়ই গঞ্জের বাজার থেকে বৌমার জন্য নানা উপহার নিয়ে আসতেন। পারুলও সংসারের প্রতিটি কাজে শাশুড়িকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করতেন। অবসর সময়ে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত, নিয়মিত নামাজ আদায় এবং ধর্মীয় অনুশীলনে তিনি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন।

কিছুদিন পর মান্নান-পারুল দম্পতির ঘরে প্রথম সন্তান হিসেবে জন্ম নেয় এক কন্যা। নাম রাখা হয় মধু। কয়েক বছরের ব্যবধানে তাঁদের সংসার আরও পরিপূর্ণ হয়। একে একে জন্ম নেয় তিন পুত্রসন্তান—পলাশ, শিমুল ও মুকুল। এখন তাঁদের সংসারে এক কন্যা ও তিন পুত্রসন্তান।

স্বামী মান্নান ব্যবসার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। পরবর্তীতে তিনি কপিলমুনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান হওয়ার পর তাঁর ব্যস্ততা আরও বেড়ে যায়। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তিনি জনসেবামূলক কাজেই অধিকাংশ সময় কাটাতেন। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সংসারের নানা বিষয় কিংবা সন্তানদের লেখাপড়ার খোঁজখবর নিয়মিত নেওয়ার সুযোগ তাঁর হতো না।

তবে স্ত্রী পারুলের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। সুযোগ পেলেই তিনি স্ত্রীকে বলতেন,

"আমার ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তুমি অবশ্যই করবে। তাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে কখনো কোনো আপস করবে না।"

জনহিতকর কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ মান্নান পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায় থেকে একাধিক সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হন। পারুলও সবসময় স্বামীর প্রতিটি জনকল্যাণমূলক কাজে নীরবে সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি আল্লাহর কাছে তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সফলতার জন্য নিয়মিত দোয়া করেছেন।

এভাবেই সুখ-শান্তিতে এগিয়ে চলছিল মান্নান-পারুলের সংসার। মধু ও পলাশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। অন্যদিকে শিমুল ও মুকুলও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দাদির সঙ্গে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া-আসা শুরু করেছে। সংসার, সন্তানদের লেখাপড়া এবং স্বামীর জনসেবামূলক ব্যস্ততার মধ্যেও পারুল নীরবে, নিরলসভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন।

অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে মান্নান ইতোমধ্যেই কপিলমুনি ইউনিয়নে নানাবিধ জনহিতকর কাজ সম্পন্ন করেছেন। তাঁর প্রতিটি উদ্যোগে পারুল ছিলেন নীরব অথচ অবিচল এক সহযাত্রী। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তিনি স্বামীকে সহযোগিতা করেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন এবং মানসিক শক্তি জুগিয়েছেন।

নিজের সন্তানদের লেখাপড়ার বিষয়ে যেমন মান্নান ছিলেন অত্যন্ত সচেতন, তেমনি তিনি কপিলমুনিতে একটি আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার স্বপ্নও লালন করতেন। সংসারের অবসর মুহূর্তে তিনি প্রায়ই এসব পরিকল্পনা নিয়ে পারুলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করতেন। পারুল মনোযোগ দিয়ে স্বামীর প্রতিটি কথা শুনতেন। তাঁর সময়োপযোগী চিন্তাভাবনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং জনকল্যাণমূলক স্বপ্নের প্রতি পারুলের ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও অকুণ্ঠ সমর্থন।

মান্নান উপলব্ধি করেছিলেন যে, অল্পশিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি। একই সঙ্গে যেসব শিক্ষার্থী আর্থিক বা সামাজিক কারণে পিছিয়ে পড়ছে, তাদের জন্য একটি মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাও সময়ের দাবি। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানই একটি সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।

কপিলমুনির অন্যতম ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ভারতচন্দ্র হাসপাতাল, যা আধুনিক কপিলমুনির রূপকার রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মান্নানের ইচ্ছা ছিল এই হাসপাতালকে আরও আধুনিক ও কার্যকর চিকিৎসাকেন্দ্রে পরিণত করা। এ লক্ষ্যে তিনি সর্বদা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতেন।

অন্যদিকে, কপিলমুনির নিষিদ্ধপল্লী নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, এই পরিবেশ এলাকার সামাজিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে এবং আগামী প্রজন্মের সুস্থ বিকাশের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তিনি দৃঢ় সংকল্প করেছিলেন—একদিন এই নিষিদ্ধপল্লী উচ্ছেদ করে এলাকার ছেলে-মেয়েদের জন্য একটি সুস্থ ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলবেন। পারুল স্বামীর এই প্রতিটি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের নীরব প্রেরণার উৎস হয়ে পাশে থেকেছেন।

এভাবেই সুখ, স্বপ্ন এবং জনসেবার আদর্শকে ধারণ করে এগিয়ে চলছিল তাঁদের সংসার।

কিন্তু আশির দশকের শেষের দিকে হঠাৎ করেই মান্নান শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। স্থানীয় চিকিৎসক থেকে শুরু করে খুলনা ও সাতক্ষীরার অভিজ্ঞ ডাক্তারদের শরণাপন্ন হয়েও তেমন কোনো সুফল পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচার করাতে হবে। সে সময় খুলনায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে কোথায় চিকিৎসা করানো হবে, তা নিয়ে মান্নান ও পারুলের উদ্বেগ দিন দিন বাড়তে থাকে।

এ সময় পারুলের ভাই রশিদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বোন ও দুলাভাইয়ের প্রতি তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও আন্তরিক ভালোবাসা। পারুল চিঠির মাধ্যমে রশিদকে সব জানালেন। খবর পেয়ে রশিদ দ্রুত বাড়িতে চলে আসেন এবং বোন ও দুলাভাইকে আশ্বস্ত করে বলেন,

"বুবু, কোনো চিন্তা করো না। আমি দুলাভাইকে নিয়ে রাজশাহী যাব। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর অপারেশন করানো হবে। তুমি কোনো দুশ্চিন্তা করো না। তুমি শুধু সন্তানদের নিয়ে বাড়িতে থাকো।"

রশিদের দৃঢ় আশ্বাসে মান্নান ও পারুল অনেকটাই সাহস ফিরে পেলেন। অনেক ভাবনাচিন্তার পর সিদ্ধান্ত হলো, মান্নান রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে অস্ত্রোপচার করাবেন।

রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে তিনি সংসারের সব বিষয় পারুলকে বুঝিয়ে দিলেন। বারবার শুধু একটি কথাই বললেন,

"আমার সন্তানদের প্রতি সব সময় খেয়াল রাখবে। তাদের লেখাপড়া যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।"

পারুল চোখের জল লুকিয়ে স্বামীকে আশ্বস্ত করলেন,

"আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আপনি শুধু নিজের যত্ন নেবেন। আল্লাহর রহমতে সব ভালো হবে।"

কথাগুলো বললেও বুকের ভেতরের চাপা কষ্ট তাঁর মুখটিকে বিষণ্ন করে তুলেছিল। অবশেষে মান্নান রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হলেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নিরবে অনেক কেঁদেছেন। কিন্তু সন্তানদের সামনে নিজেদের শক্ত রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন।

মধু ও পলাশ প্রতিদিনের মতো স্কুলে যেত। আর পারুল অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন—কখন ডাকপিয়ন সাইকেলের ঘণ্টা বাজিয়ে এসে বলবেন, "আপনাদের চিঠি আছে।"

অন্যদিকে শিমুল ও মুকুল প্রায় প্রতিদিনই বাবার সঙ্গে কাশিমনগর বাজারে যেত। বাবার অনুপস্থিতিতে তাদের মন ভীষণ খারাপ হয়ে থাকত। পারুল সন্তানদের সেই কষ্ট বুঝতে পারতেন। তাই বাড়ির অন্যদের দিয়ে মাঝে মাঝেই তাদের জন্য মিষ্টি ও নানা খাবার আনিয়ে রাখতেন, যেন কিছুটা হলেও তারা বাবার অভাব ভুলে থাকতে পারে।

অবশেষে একদিন বহু প্রতীক্ষিত সেই মুহূর্ত এলো। ডাকপিয়ন এসে একটি চিঠি দিয়ে গেলেন। মান্নান রাজশাহী থেকে লিখেছেন। শুধু পারুলের জন্য নয়, তাঁর প্রতিটি সন্তানকেও আলাদা করে চিঠি লিখেছেন।

স্ত্রীর উদ্দেশে তিনি লিখেছেন,

"আমি ভালো আছি, পারুল। আমার জন্য কোনো চিন্তা করো না। আমার অপারেশন হয়ে গেলে আমি দ্রুত বাড়ি ফিরে আসব। আমাদের সন্তানদের লেখাপড়ার প্রতি সব সময় খেয়াল রাখবে।"

চিঠিটি পড়তে পড়তে পারুলের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। তিনি সন্তানদের একে একে বাবার লেখা চিঠি পড়ে শোনালেন। তারপর বললেন,

"তোমাদের আব্বা খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন। তোমরা সবাই মন দিয়ে লেখাপড়া করো। তা না হলে তোমাদের আব্বা খুব কষ্ট পাবেন।"

সন্তানরাও তাদের বাবা-মাকে গভীরভাবে ভালোবাসত। মান্নান ও পারুল কখনো সন্তানদের ছাড়া একসঙ্গে বসে খাবার খেতেন না। ছেলে-মেয়েরা স্কুল থেকে বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত তাঁরা দুজনই অপেক্ষা করতেন। পরিবার ছিল তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি, আর সন্তানদের হাসিমুখই ছিল তাঁদের সকল পরিশ্রম ও স্বপ্নের প্রেরণা।

স্থানীয় কপিলমুনি কলেজে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার সুবিধার্থে মান্নান, আহারাম উদ্দিন, বাহারুল ইসলাম ও বাবলুর রহমান কলেজপড়ুয়াদের জন্য বাসস্থান ও খাবারের ব্যবস্থা করে দেন। তারা সর্বদা সন্তানদের লেখাপড়ার প্রতি যত্নশীল ছিলেন।

অবশেষে মান্নান রশিদের সহযোগিতায় অপারেশন সম্পন্ন করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে আসেন। ছেলে-মেয়ে, গ্রামবাসীসহ সবাই আনন্দিত হয়—চেয়ারম্যান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। খুশিতে পারুলের চোখে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ে।

সুস্থতা ফিরে পাওয়ার পর মান্নান আবার নানা ধরনের সামাজিক কাজে মনোনিবেশ করেন। তিনি স্ত্রী পারুলকে জানান যে খুলনা মহাকুমার ডিসি মহোদয় তাদের গ্রামে একটি ইংরেজি মাধ্যম ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে পর্যাপ্ত অর্থ তার হাতে নেই। তাই তিনি স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে বলেন, “আমার কিছু সঞ্চিত অর্থ আছে, তোমার কাছেও যদি কিছু থাকে তবে দাও। প্রতিষ্ঠান করতে হলে জমির প্রয়োজন হবে।”

স্বামীর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য পারুল মানসিকভাবে তাকে সমর্থন করেন এবং নিজের কাছে থাকা নগদ অর্থ স্বামীর হাতে তুলে দেন। মান্নান পারুলকে বলেন, “যা কিছু করা হবে নিঃস্বার্থভাবে করতে হবে। আমরা আমাদের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা সচিব এবং খুলনা জেলা প্রশাসকের নামে জমি রেজিস্ট্রি করবো। আল্লাহ না করুন, যদি আমাদের জীবদ্দশায় প্রতিষ্ঠানটি করতে না পারি, তবুও যেন জমিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সংরক্ষিত থাকে।”

পারুল স্বামীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সম্মতি প্রদান করেন। মান্নান জমি ক্রয়ের পর সরকারের বিভিন্ন মহলে প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এভাবে কয়েক বছর কেটে যায়।

এ সময় মান্নান ও পারুলের কন্যার বিবাহ হয় গ্রামের মধ্যেই। জামাতা ও শ্বশুর-শাশুড়ির মধ্যে পারস্পরিক ভক্তি ও ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তারাও মেয়েকে অনেক স্নেহ করেন।

পলাশ মাধ্যমিকের পর টেকনিক্যাল শিক্ষায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। তার এই আগ্রহ দেখে পিতা অত্যন্ত খুশি হন এবং তাকে একটি টেকনিক্যাল স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। শিমুল তখন এসএসসি পরীক্ষার কয়েক মাস আগে পড়াশোনা করছে। মুকুল পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত ছিল। তাদের লেখাপড়ায় নিয়মিত সহায়তা করতেন হাসেম আলী স্যার।

মুকুল পঞ্চম শ্রেণীতে ভালো ফল করে বৃত্তি লাভ করে। শিমুল মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। এতে বাবা-মা অত্যন্ত খুশি হন। পিতা মুকুলকে একটি লাল রঙের ছোট সাইকেল উপহার দেন এবং শিমুলকে একটি হাতঘড়ি দেন। আত্মীয়স্বজন সবাই আনন্দিত হয়।

এভাবেই আরও ১–২ বছর ভালোভাবেই কেটে যায়। মাঝেমধ্যে মান্নান অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় ডাক্তার দেখালে তিনি সুস্থ হয়ে উঠতেন।

হঠাৎ এক রাতে মান্নান উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে স্ট্রোক করেন। পুরো পরিবার শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। এদিকে মুকুলের বৃত্তি পরীক্ষা খুলনায় অনুষ্ঠিত হবে। শিমুল ও হাসেম আলী স্যার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে মুকুলকে খুলনা বঙ্গভাষী স্কুলে নিয়ে গিয়ে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করেন।

চেষ্টা ও দোয়ায় মুকুল আবার বৃত্তি লাভ করে। পারুল খুব খুশি হন, তবে স্বামীর কথা ভেবে দুঃখও অনুভব করেন। তিনি মনে মনে ভাবেন, মান্নান সুস্থ থাকলে ছেলের এই সাফল্যে অত্যন্ত আনন্দিত হতেন।

পারুল তার সাধ্যের মধ্যে স্বামীর উন্নত চিকিৎসার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। খুলনা মেডিকেল কলেজে দীর্ঘ চিকিৎসার পর সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, “তোমাদের বাবাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে।” হাতে থাকা সমস্ত সঞ্চিত অর্থ তিনি স্বামীর চিকিৎসার জন্য ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেন।

ছেলেমেয়ে, জামাতা—সবাই মান্নানকে অত্যন্ত ভালোবাসে। পারুলের আদরের ভাই রশিদ এখন কপিলমুনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ভাগ্নেদের খুব ভালোবাসেন। মুকুলের বৃত্তি লাভে তিনি অত্যন্ত খুশি হন এবং সিদ্ধান্ত নেন তাকে একটি সোনার হার উপহার দেবেন। সেই অনুযায়ী তিনি কপিলমুনির একটি স্বর্ণকারের দোকানে সোনার চেনের অর্ডার দেন।

এদিকে অসুস্থ মান্নান এখন আর চলাফেরা করতে পারেন না, এমনকি নিজে খেতেও পারেন না। কিন্তু তার জীবনসঙ্গিনী পারুল এক মুহূর্তের জন্যও তার সেবায় অবহেলা করেন না। স্বামীকে নিয়মিত খাবার খাওয়ানো, ওষুধ দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা—সবকিছুই তিনি নিজের হাতে করেন। ছেলেরাও যথাসাধ্য পিতার সেবা করে।

পারুল তার অবশিষ্ট স্বর্ণালংকার—গলার হার, কানের দুল ইত্যাদি—বন্ধক রেখে স্বামীর চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, স্বামীকে ভারতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাবেন। লোকমুখে তিনি জানতে পারেন যে, ভারতে নিউরোলজির একজন বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. টি. কে. দাস আছেন। সেই চিকিৎসকের কাছেই মান্নানকে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা করেন তিনি।

বড় ছেলে পলাশ, জামাতা আসলাম, ননদ সখিনা এবং ছোট সন্তানদের নিয়ে পারুল ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তাদের সঙ্গে ছিল আদরের নাতনি চম্পাও। শিমুল ও মুকুলের মন খুবই খারাপ হয়ে যায়—তাদের বাবা-মা দুজনই দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন।

যাওয়ার আগে মা পারুল সন্তানদের বারবার বলে যান—“নিয়মিত পড়াশোনা করবে, স্কুলের পড়া এবং হাসেম আলী স্যারের দেওয়া পড়াগুলো মনোযোগ দিয়ে করবে। আমি তোমাদের বাবাকে সুস্থ করে ফিরে আসব, ইনশাআল্লাহ।”

ছেলেরা মায়ের কথায় আশ্বস্ত হয়। পারুল ভারতে গিয়ে স্বামীর যথাসাধ্য চিকিৎসা করান এবং পরে দেশে ফিরে আসেন। চিকিৎসক দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

এরপর পারুল এক মুহূর্তের জন্যও স্বামীকে একা রেখে কোথাও যান না। কয়েক বছর ধরে স্বামীর সেবা-শুশ্রূষাই তার নিত্যদিনের কাজ হয়ে ওঠে।

মান্নান সুস্থ থাকা অবস্থায় নতুন ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। পারুলের খুব ইচ্ছা ছিল, এই নতুন বাড়িতে তিনি স্বামীর সঙ্গে বসবাস করবেন। কিন্তু স্বামীর চিকিৎসা, সন্তানদের লেখাপড়া এবং ঘরের কাজ—সব মিলিয়ে পারুলের জীবন যেন এক কঠিন সংগ্রামে পরিণত হয়। তবুও তিনি সবর ও বিনয়ের সঙ্গে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকেন।

একপর্যায়ে অর্থের অভাবে রশিদ মুকুলকে দেওয়া সোনার হার বন্ধক রাখতে হয়। তবুও পারুলের ইচ্ছা পূরণ হয়—নতুন ঘরে বসবাসের প্রস্তুতি শুরু হয়।

মান্নানের একটি বড় ইচ্ছা ছিল পুত্রবধূর মুখ দেখা। তাই পারুল নানা চেষ্টা করে বড় ছেলে পলাশের বিয়ে সম্পন্ন করেন। সেই সোনার হার দিয়েই নববধূকে বরণ করা হয়।

কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই মান্নান ইন্তেকাল করেন। পুরো পরিবার শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। পারুল সন্তানদের আশ্বস্ত করে বলেন, “তোমাদের বাবার শূন্যতা আমি পূরণ করতে পারব না, তবে মাতৃস্নেহে তোমাদের আগলে রাখব। তোমরা মন দিয়ে লেখাপড়া করবে।”

অত্যন্ত কষ্টের মধ্যেও পারুল সংসারের খরচ সঞ্চয় করে নাতনিকে একটি গলার হার উপহার দেন। ঐশ্বর্য, বংশের প্রথম নাতনি হওয়ায় তিনি তাকে বিশেষভাবে স্নেহ করেন।

শিমুল ও মুকুল পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকে। শিমুল ঢাকায় ঢাকা কলেজে এবং মুকুল খুলনা পাবলিক কলেজে পড়াশোনা করে। দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে পারুল কঠোর পরিশ্রম ও সঞ্চয়ের মাধ্যমে সংসার চালান।

মুকুলের খুলনার পড়াশোনা শেষ হয়। দুই ভাইয়ের মধ্যে মায়ের প্রচেষ্টায় গভীর মমতার বন্ধন তৈরি হয়। তারা একসঙ্গে থাকলে পারুলের দুশ্চিন্তা কমে যায়।

এরপর মুকুলের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ আসে, কিন্তু পারুলের মনে দ্বিধা দেখা দেয়।

কারণ মায়ের ইচ্ছা ছিল—তার দুই সন্তান একত্রে থাকলে এক ভাই আরেক ভাইয়ের খেয়াল রাখতে পারবে। পারুল কখনো ঢাকার চিন্তা করেন না। তিনি সর্বদা চেষ্টা করেন যেন তার দুই সন্তান ভালো মানুষ হয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে।

পারুল তার স্বামীকে কথা দিয়েছিলেন, “তোমাদের লেখাপড়ার কোনো কমতি হবে না।” তিনি সর্বদা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। জমি-জমা থেকে যে আয় হতো, তা দিয়েই দুই ছেলের লেখাপড়ার খরচ চালানো হতো। তবে অনেক সময় প্রাপ্য টাকা সময়মতো না পাওয়ায় সমস্যায় পড়তে হতো।

ছেলেদের ভর্তি, পরীক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনে পারুল কয়েকবার তার স্বর্ণের হার বাজারে বন্ধক রেখে অর্থ সংগ্রহ করেন এবং ব্যাংক বা মানি অর্ডারের মাধ্যমে ছেলেদের কাছে টাকা পাঠিয়ে দেন।

ছাত্রজীবনে শিমুল দেশের জাতীয় পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত লেখালেখি করত। পারুল বাজার থেকে পত্রিকা কিনে ছেলের লেখা পড়ে অত্যন্ত আনন্দিত হতেন এবং আত্মীয়-পরিজন ও পাড়াপড়শিদেরও তা দেখাতেন।

মুকুল ক্রমাগত মেধার স্বাক্ষর রেখে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অর্জন করে ভর্তি হয়। তার ফলাফল অত্যন্ত ভালো হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাকে খুবই স্নেহ করতেন। অনেক শিক্ষক তার বাড়িতেও আসতেন।

শিমুল লেখাপড়া শেষ করে দেশের প্রথম সারির অনলাইন পত্রিকা “সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ”-এর স্থায়ী প্রতিবেদক হিসেবে যোগদান করে। পাশাপাশি দেশের পুরোনো ও স্বনামধন্য দৈনিক সংবাদপত্র “দৈনিক সংবাদ”-এর সঙ্গেও যুক্ত হয়। এতে পারুলের দুশ্চিন্তা ধীরে ধীরে কমে আসে।

মুকুল লেখাপড়া শেষ করে দেশের একটি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবি-তে গবেষক হিসেবে যোগদান করে। পারুলের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে যায়। তিনি ইতিমধ্যে কয়েকবার ঢাকায় গিয়ে দুই ছেলের কাছে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে আসেন।

ঢাকায় সেলিনা ও প্রিন্স নামে তার ভাগ্নে-ভাগ্নিরা তাকে খুব আদর-যত্ন করেন। বাড়িওয়ালা সিদ্দিক সাহেব এবং তার স্ত্রী ফিরোজা বেগম পারুলকে “মামি” বলে সম্বোধন করেন এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন। তাদের ভালোবাসায় পারুল গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হন।

বাংলাদেশ সরকার যখন কারিগরি শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে, তখন ছোট ভাই রশিদ—যিনি উপজেলা চেয়ারম্যান—তার সহযোগিতায় বড় ছেলে পলাশ ও পারুলের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। তারা একটি ইংরেজি মাধ্যম টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। সেই জমি আগেই প্রস্তুত ছিল।

পারুল বড় ছেলেকে উৎসাহ দেন এবং ভাই রশিদুজ্জামানও স্কুল প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। বহু চেষ্টার পর পারুল, ভাই রশিদ এবং গ্রামের মানুষের সহযোগিতায় স্বামীর স্বপ্নের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়।

তখন ছেলেদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। পারুল স্বামীর জমি বন্ধক রেখে এবং নিজের গলার হার বন্ধক রেখে প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে সন্তানদের হাতে তুলে দেন।

প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য একজন দক্ষ অধ্যক্ষের প্রয়োজন ছিল। পারুল শিমুলকে বোঝান যে এটি তার বাবার আজীবনের স্বপ্ন। তিনি বলেন, “তোমার পিতা ও আমার স্বপ্ন তুমি পূরণ করবে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী এখানে লেখাপড়া করবে।”

অবশেষে শিমুল প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব গ্রহণ করে। পারুল অত্যন্ত খুশি হন।

এদিকে ছোট ছেলে মুকুল তার মেধা ও যোগ্যতায় একটি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে। পারুল মাঝেমধ্যেই খুলনায় গিয়ে ছোট ছেলের কাছে সময় কাটান। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক মুকুলের মা হিসেবে পারুলকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন এবং সময় পেলে তার বাসায় আসেন।

সময়গুলো পারুলের ভালোভাবেই কাটতে থাকে। শিমুল ও মুকুল দুজনেরই বিয়ে সম্পন্ন হয়। বউমারাও শিক্ষিত ও ভদ্র। পারুল বিবাহের সময় তাদের অভিভাবকদের প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি তাদের মেয়েদের নিজের সন্তানের মতোই দেখবেন এবং লেখাপড়ার সুযোগ করে দেবেন।

নিজের গলার হার দিয়ে বউমাদের বরণ করে নেন এবং তাদের মুখ দর্শন করেন।

মান্নানের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমিক শাখা ইতিমধ্যে এমপিওভুক্ত হয়। পারুল অত্যন্ত খুশি হয়ে মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকেন যেন তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান আরও উন্নতি লাভ করে।

পারুল ছোটবেলা থেকেই নামাজী ছিলেন। যেখানে তারা বসবাস করতেন, সেখানে আশেপাশে কোনো মসজিদ না থাকায় এলাকাবাসী ফরজ ও এশার নামাজ পড়তে কষ্ট পেত। পারুল তার ছেলেদের উৎসাহ দেন একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করতে।

সবার সঙ্গে আলোচনা করে পারুল শিমুলকে নিয়ে মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। অর্থ সংকট দেখা দিলে তিনি আবারও আনন্দচিত্তে নিজের গলার হার বন্ধক রেখে মসজিদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন।

তিনি সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ করেন এবং প্রার্থনা করতে থাকেন যেন তার ছেলেদের সকল কাজ সহজ হয়।

মুকুল স্কলারশিপের জন্য নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যায়। কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে (Saskatchewan University)-এ মুকুলের স্কলারশিপ হয়। পারুল এতে খুব খুশি হন, কিন্তু তার আদরের ছোট ছেলে দূরে চলে যাবে—এই ভেবে তিনি মন খারাপ করেন। ছেলেরা তাকে বোঝায় যে মুকুল আবার ফিরে আসবে। ইতিমধ্যে মুকুল একাধিকবার কানাডা থেকে দেশে এসে কয়েক মাস করে মায়ের সঙ্গে থেকেছে।

পারুলের আনন্দের সীমা থাকে না। নাতি-নাতনিদের কী খাওয়াবেন, কীভাবে আদর করবেন—এসব নিয়েই তিনি ব্যস্ত থাকেন।

মান্নানের মৃত্যুর পর কয়েক বছর পারুল তুলনামূলকভাবে সুস্থ ছিলেন। ২০০৭ সালের দিকে শিমুলের ইংল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সুযোগ হয়। সব প্রস্তুত হয়ে গেলেও পারুল বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি ভাবতেন, “আমার পিতাহারা সন্তান আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাবে।” এই দুশ্চিন্তায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিছুদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। মায়ের এই অসুস্থতার কারণে শিমুল তার বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।

এরপর ছোট ছেলে মুকুল ও শিমুল তাকে ওমরাহ করিয়ে নিয়ে যায়। এতে পারুল অত্যন্ত খুশি হন। তিনি পবিত্র কাবা ঘর তাওয়াফ করেন এবং প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারত করেন।

বছর গড়িয়ে গেলে বার্ধক্যজনিত কারণে পারুলের শরীর মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ত। বড় ও মেজো ছেলে তার সঙ্গে থাকতেন। তবে ছোট ছেলে মুকুলের জন্য তার মন সবসময় অস্থির থাকত। সকাল-সন্ধ্যা ছেলেদের ও নাতি-নাতনিদের খোঁজ নেওয়াই ছিল তার নিত্যদিনের কাজ।

পারুল সুস্থ থাকা অবস্থায় সর্বদা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন—“হে আল্লাহ, আমাকে যেন সুস্থ অবস্থায় তোমার কাছে নিয়ে যাও।”

শিমুলের বন্ধু ডাক্তার বিশ্বজিৎ, খুলনা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক, পারুলকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি পারুলের চিকিৎসায় সহায়তা করতেন। চিকিৎসক জানান, তার শরীরে কোনো গুরুতর রোগ নেই; সমস্যাটি মূলত বার্ধক্যজনিত।

একদিন সকালে হঠাৎ পারুল অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছেলেমেয়েরা সবাই মায়ের পাশে থেকে সাধ্যমতো সেবা-শুশ্রূষা করতে থাকে। তারা সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিন সবাই মায়ের কাছেই থাকবে। চিকিৎসক প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেন।

শিমুল সারারাত মায়ের শিয়রে বসে থাকেন। মাঝরাতে পারুল চিরবিদায় নেন। শিমুলের এক হাত ছিল মায়ের মাথার উপর, অন্য হাত মায়ের হাত ধরে ছিল। মায়ের মৃত্যুতে চারপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের ঘুম ভেঙে যায়, সবাই ছুটে আসে।

নিঃশব্দ পারুলের নিথর দেহ জড়িয়ে ধরে শিমুলের আর্তনাদে সবাই স্তব্ধ হয়ে যায়।

পারুল প্রায়ই বলতেন, “রক্ত জ্বালা করে।” তার আদরের ছোট ছেলে নিয়মিত ফোন করে মায়ের খোঁজ নিত। সন্তানরা সর্বদা চেষ্টা করত যেন মা কোনো কষ্ট না পান।

কে ভেবেছিল, সেই মা আর বেঁচে নেই? যে মা আকাশে বিমান দেখলে ভাবতেন—“আমার ছেলে হয়তো এই বিমানে করে বাড়ি ফিরছে”—সেই মায়ের মৃত্যুসংবাদ কীভাবে সন্তানদের জানানো হবে?

পারুল স্বর্ণালংকার খুব পছন্দ করতেন। গলায় হার, হাতে আংটি, কানে দুল—সবই তার ছিল। কিন্তু সেই শরীরে আর প্রাণ ছিল না।

আমাদের সমাজে উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ সহজেই তাদের দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অভিযোগ প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো প্রায়ই তাদের কষ্ট আত্মীয়-পরিজনের কাছেও বলতে পারে না, লজ্জা বা সংকোচের কারণে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও অনেক সময় তাদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা থাকে না।

এমন বাস্তবতায় পারুলের মতো গুণী মানুষের জীবন যেন এক অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে—যিনি নিজের গলার হার, স্বপ্ন ও ত্যাগ দিয়ে মসজিদ, স্কুল, কলেজ ও সন্তানদের শিক্ষার পথ তৈরি করেছেন।

তার ব্যবহৃত গলার হার যেন এক প্রতীক হয়ে থাকবে—প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, ত্যাগ, ভালোবাসা ও মানবিকতার এক অনন্ত স্মারক হিসেবে।

সম্পাদক : আবদুল মাতিন