বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন কৃষি ও শিল্পে নতুন সম্ভাবনা

পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন কৃষি ও শিল্পে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি ও সংস্কৃতির সঙ্গে পাটের সম্পর্ক বহু পুরোনো। একসময় দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে পরিচিত ‘সোনালি আঁশ’ এখন নতুন সম্ভাবনা নিয়ে ফিরছে। পাটের আঁশ, বীজ, পাতা ও জৈব উপাদানকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় পাটের জিনোম বা জীবনরহস্য উন্মোচন কৃষি ও শিল্পে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

জিনোম হলো একটি জীবের বংশগত বৈশিষ্ট্য নিয়ন্ত্রণকারী সম্পূর্ণ জিনগত তথ্য। পাটের জিনোম বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোন জিন উদ্ভিদের বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ, আঁশের মান, ফলন কিংবা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে তা শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রচলিত কৃষিপদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক জীবপ্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নত জাত উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।


জিনোম গবেষণায় নতুন দিগন্ত

পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। পাটের জিনোমের খসড়া বিন্যাস উন্মোচনের ফলে গবেষকেরা উদ্ভিদটির বংশগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে গভীরভাবে জানার সুযোগ পেয়েছেন। আগে একটি উন্নত জাত তৈরি করতে বছরের পর বছর মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হতো। এখন জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে কাঙ্ক্ষিত গুণসম্পন্ন গাছ বাছাইয়ের কাজ আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করা সম্ভব।

বিশেষ করে উচ্চফলনশীল, উন্নতমানের আঁশ উৎপাদনকারী এবং রোগ ও প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীল জাত উদ্ভাবনে জিনোম তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা


বাংলাদেশের কৃষি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের নানা ঝুঁকির মুখে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টি, খরা, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা পাট চাষেও প্রভাব ফেলছে। বিজ্ঞানীরা পাটের জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে এসব প্রতিকূলতা সহ্য করতে পারে এমন জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন।

জিনোমভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে লবণাক্ততা, খরা কিংবা রোগ প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত জিন শনাক্ত করা গেলে সেসব বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে নতুন জাত তৈরি করা সহজ হবে। এতে পরিবর্তিত জলবায়ুতেও পাটের উৎপাদন ধরে রাখার সম্ভাবনা বাড়বে।


রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তি

পাটের উৎপাদন কমার অন্যতম কারণ বিভিন্ন রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ। কোনো রোগ প্রতিরোধে একটি গাছের কোন জিন কাজ করছে, তা শনাক্ত করা গেলে সেই বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করে রোগপ্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে জিনোম সিকোয়েন্সিং, বায়োইনফরমেটিকস ও আণবিক জীববিজ্ঞানের প্রযুক্তি গবেষকদের সহায়তা করছে। মাঠে রোগ দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ভবিষ্যতে রোগপ্রতিরোধী জাত তৈরি করে আগেই ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।


আঁশের মান উন্নয়নে জিনগত গবেষণা

পাটের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উন্নতমানের আঁশও প্রয়োজন। আঁশ কতটা শক্ত, লম্বা ও মসৃণ হবে, তার পেছনে উদ্ভিদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের ভূমিকা রয়েছে।

গবেষকেরা এসব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জিন শনাক্ত করতে পারলে কাঙ্ক্ষিত গুণসম্পন্ন পাটের জাত দ্রুত নির্বাচন ও উন্নয়ন করা সম্ভব হবে। এর ফলে পোশাক, কার্পেট, কম্পোজিট, জিওটেক্সটাইলসহ উচ্চমূল্যের বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে পাটের ব্যবহার আরও বাড়তে পারে।


পাট শুধু আঁশ নয়

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে পাটের ব্যবহার এখন আর শুধু বস্তা, দড়ি কিংবা চটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পাট থেকে তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং, কাগজ, জিওটেক্সটাইল, কম্পোজিট উপাদান, আসবাবপত্র এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্য।

পাটের কাঠি থেকেও তৈরি হতে পারে পার্টিকেল বোর্ড, চারকোল ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্য। পাটের পাতায় রয়েছে পুষ্টিগুণসম্পন্ন বিভিন্ন উপাদান, যা খাদ্য ও অন্যান্য গবেষণায় ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

অন্যদিকে পাটের সেলুলোজ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে বায়োডিগ্রেডেবল বা পরিবেশে সহজে মিশে যায় এমন পণ্য তৈরির গবেষণাও চলছে। প্লাস্টিক দূষণ কমাতে এসব পণ্যের ভবিষ্যৎ বাজার বড় হতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার

পাট গবেষণায় এখন যুক্ত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। বিপুল পরিমাণ জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন জিনের সঙ্গে কোন বৈশিষ্ট্যের সম্পর্ক রয়েছে, তা শনাক্ত করতে কম্পিউটারভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়।

এ ছাড়া স্যাটেলাইট ও ড্রোনচিত্র বিশ্লেষণ করে পাটের ক্ষেতের স্বাস্থ্য, রোগের লক্ষণ, পানির প্রয়োজন কিংবা জমির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তির সঙ্গে জিনোম গবেষণার সমন্বয় হলে পাট উৎপাদনে আরও নির্ভুল কৃষি ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠতে পারে।

কৃষকের জন্য কী সুফল?

পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের সবচেয়ে বড় সুফল শেষ পর্যন্ত কৃষকের কাছে পৌঁছানো জরুরি। উন্নত জাতের বীজ, রোগপ্রতিরোধী পাট, কম সময়ে বেশি ফলন এবং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়লে উৎপাদন খরচ কমতে পারে। একই সঙ্গে উন্নতমানের আঁশের জন্য কৃষক ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।


তবে গবেষণাগারের আবিষ্কার মাঠপর্যায়ে দ্রুত প্রয়োগ করতে হলে উন্নত বীজ উৎপাদন, মানসম্মত বীজ সরবরাহ, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং বাজারব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি।


ফিরছে ‘সোনালি আঁশের’ সম্ভাবনা

বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব ও প্রাকৃতিক তন্তুর চাহিদা বাড়ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জিনোম গবেষণা, জীবপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সমন্বয় বাংলাদেশের পাট খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

একসময় পাট ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস। এখন সেই পাটকে শুধু ঐতিহ্যের পণ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির হাত ধরে পাট হতে পারে পরিবেশবান্ধব শিল্পের কাঁচামাল, আধুনিক কৃষির অংশ এবং নতুন প্রজন্মের উচ্চমূল্যের পণ্যের ভিত্তি।

পাটের জীবনরহস্য যত উন্মোচিত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে ‘সোনালি আঁশের’ ভবিষ্যৎ শুধু মাঠে নয়, গবেষণাগার ও প্রযুক্তির জগতেও তৈরি হচ্ছে।


সম্পাদক : আবদুল মাতিন