জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নাগরিকদের প্রয়োজনীয় খাদ্য ও সরঞ্জাম মজুতের পরামর্শ দিচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার। যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডসসহ বেশ কয়েকটি দেশ এ বিষয়ে নাগরিকদের নির্দেশনা দিয়েছে।
যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাইবার হামলা কিংবা বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বিবেচনায় নাগরিকদের আগাম প্রস্তুতি নিতে বলছে বিভিন্ন দেশের সরকার। কোথাও তিন দিন, কোথাও এক সপ্তাহ, আবার কোথাও ১০ দিনের প্রয়োজনীয় খাবার-পানি ও জরুরি সামগ্রী রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর জন্য নেওয়া হয়েছে ৯০ দিনের প্রস্তুতির উদ্যোগও। এসব পদক্ষেপ কি বড় কোনো বিপর্যয়ের ইঙ্গিত, নাকি নিয়মিত দুর্যোগ প্রস্তুতির অংশ?
বিভিন্ন দেশের সরকারি নির্দেশনা এবং বিবিসি, নিউজউইক, স্কাই নিউজ ও দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই প্রস্তুতির পেছনে রয়েছে একাধিক উদ্বেগ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চরম আবহাওয়া, সাইবার হামলা, যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগব্যবস্থা সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কাও বিবেচনায় নিচ্ছে দেশগুলো।
তবে এসব নির্দেশনাকে আসন্ন কোনো যুদ্ধ বা বড় বিপর্যয়ের নিশ্চিত সংকেত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক দেশেই নাগরিকদের দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার কর্মসূচি দীর্ঘদিনের।
তিন দিনের প্রস্তুতি নিতে বলছে যুক্তরাজ্য
যুক্তরাজ্য সরকার ‘বি রেডি’ নামে একটি প্রচারাভিযান চালাচ্ছে নাগরিকেরা যেন অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন নিজেদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারেন।
এ জন্য একজনের প্রতিদিনের জন্য তিন লিটার খাবার পানি, সহজে নষ্ট হয় না এমন খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক এবং ব্যাটারিচালিত বা হাতল ঘুরিয়ে চালানো যায় এমন রেডিও রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশ সরকারের আশঙ্কা, ঝড়, বন্যা, বিদ্যুৎবিভ্রাট কিংবা সাইবার হামলার কারণে জরুরি পরিষেবা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারগুলো কয়েক দিন নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পারলে উদ্ধার ও সহায়তাকারী সংস্থাগুলো সবচেয়ে বেশি বিপদে থাকা মানুষদের দ্রুত সহায়তা দিতে পারবে।
সরকারের এই প্রচারের পর দেশটির কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে জরুরি সামগ্রীর বিক্রি বেড়েছে। বিবিসির ‘নিউজ নাইট’ অনুষ্ঠানের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, সুপারমার্কেট চেইন আইসল্যান্ডে এক সপ্তাহান্তে টিনজাত খাবারের বিক্রি বেড়েছে ৪০ শতাংশ। বোতলজাত পানির বিক্রিও বেড়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
গৃহস্থালির ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বিক্রেতা রবার্ট ডায়াস জানিয়েছে, আগের সপ্তাহের তুলনায় তাদের রেডিও বিক্রি বেড়েছে ১৬০ শতাংশ।
অন্যদিকে ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রেতা ম্যাপলিনের হিসাবে, সরকারি ঘোষণার পর রেডিওর বিক্রি ৯২ শতাংশ, টর্চলাইটের বিক্রি ২৮৪ শতাংশ এবং পাওয়ার ব্যাংকের বিক্রি ১০৬ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আগের মাসের একই সময়ের সঙ্গে এই পরিসংখ্যানের তুলনা করেছে।
জরুরি সরঞ্জাম বিক্রি করে এমন কয়েকটি ছোট প্রতিষ্ঠানও চাহিদা বাড়ার কথা জানিয়েছে। তবে এসব পরিসংখ্যান কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। এগুলো দিয়ে গোটা যুক্তরাজ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বা খাদ্যসংকট তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আইসল্যান্ড জানিয়েছে, তাদের টিনজাত খাবারসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
কোথাও তিন দিন, কোথাও ১০ দিনের প্রস্তুতি
শুধু যুক্তরাজ্য নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
২৮ অক্টোবর প্রকাশিত নিউজউইকের এক প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশের এ ধরনের নির্দেশনা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের পাশাপাশি কানাডা, জাপান, মেক্সিকো ও নেদারল্যান্ডসেও তিন দিনের জরুরি সামগ্রী রাখার পরামর্শ রয়েছে।
সুইডেন ও নরওয়েতে প্রায় এক সপ্তাহ এবং জার্মানিতে ১০ দিনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। ভারতে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জরুরি সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দিলেও সবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ওয়েবসাইট ‘রেডি ডট গভ’-এও কয়েক দিন চলার মতো খাবার, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী রাখার নির্দেশনা রয়েছে।
তবে দেশগুলোর প্রস্তুতির কারণ এক নয়। জাপানের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে ভূমিকম্প ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে স্থানীয় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আলাদা প্রস্তুতির নির্দেশনা রয়েছে।
এ ছাড়া এসব কর্মসূচির সবই সাম্প্রতিক নয়। অনেক দেশে দীর্ঘদিন ধরে দুর্যোগ মোকাবিলায় নাগরিকদের প্রস্তুত রাখার উদ্যোগ চালু রয়েছে।
যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ভাবাচ্ছে ইউরোপকে
ইউরোপের দেশগুলোতে জরুরি প্রস্তুতির বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে।
ইউরোপীয় কমিশন ২০২৫ সালের মার্চে ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ ঘোষণা করে। এতে সদস্যদেশগুলোর নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ইউরোপীয় কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘাত, সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামগ্রিক প্রস্তুতি প্রয়োজন।
সুইডেনের সরকারি নির্দেশিকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অন্যান্য সংকটের পাশাপাশি যুদ্ধের পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। দেশটির নাগরিকদের এক সপ্তাহ চলার মতো খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে।
তবে সুইডেনে যুদ্ধকালীন নাগরিক প্রস্তুতির নির্দেশনা একেবারে নতুন নয়। দেশটিতে এ ধরনের নির্দেশিকা প্রকাশের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সাম্প্রতিক সংস্করণে পরিবর্তিত নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে তিন মাসের প্রস্তুতি
নাগরিকদের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
২ নভেম্বর দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, বাইরে থেকে সহায়তা না পেলেও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলো যেন অন্তত ৯০ দিন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।
এ জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানির স্বনির্ভরতা, সরবরাহব্যবস্থা, জরুরি মজুত এবং সাইবার নিরাপত্তা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এই ৯০ দিনের প্রস্তুতি সাধারণ নাগরিকদের জন্য নয়। এটি মূলত সামরিক স্থাপনাগুলোর কার্যক্রম সচল রাখার সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ।
তাহলে কি বড় কোনো বিপর্যয় আসছে?
বিভিন্ন দেশের এসব উদ্যোগের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় রয়েছে—জরুরি পরিস্থিতিতে বাইরের সহায়তা না পাওয়া পর্যন্ত নাগরিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো যেন নিজেদের প্রয়োজন সামাল দিতে পারে।
আধুনিক জীবনযাত্রায় বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট, ব্যাংকিং ও যোগাযোগব্যবস্থা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সাইবার হামলায় একটি পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেলে অন্য পরিষেবাগুলোও ব্যাহত হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে খাবার, পানি ও জরুরি সরঞ্জামের সীমিত মজুত মানুষের দুর্ভোগ কমাতে পারে।
ব্রিটিশ সরকারও নাগরিকদের একবারে বিপুল পরিমাণ খাবার বা পানি কিনে রাখার পরামর্শ দেয়নি। বরং ঘরে আগে থেকেই থাকা সামগ্রী পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে জরুরি জিনিসপত্র যোগ করার কথা বলেছে।
পাশাপাশি প্রতিবেশীদের খোঁজ রাখা, জরুরি যোগাযোগের নম্বর লিখে রাখা এবং যাদের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন, তাঁদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিভিন্ন দেশের এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নিশ্চিত করা। যুদ্ধ, খাদ্যসংকট কিংবা বড় কোনো বিপর্যয় আসন্ন—এসব নির্দেশনা তেমন কোনো নিশ্চিত পূর্বাভাস দিচ্ছে না। তবে বিশ্বজুড়ে দুর্যোগ, নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রস্তুতির গুরুত্ব যে বাড়ছে, তা স্পষ্ট।
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























