গণভোটে এগিয়ে রয়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোট। নির্বাচন কমিশন, বিভিন্ন জেলার রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় এবং প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৫৬টি আসনে গণভোটের আংশিক ফলাফল গতকাল রাত একটা পর্যন্ত জানা গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গতকাল বৃহস্পতিবার জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়।
যে ৫৬টি সংসদীয় আসনের গণভোটের ফলাফল জানা গেছে, তাতে মাত্র দুটি আসন (রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি) ছাড়া বাকি সব কটিতে ‘হ্যাঁ’ ভোট এগিয়ে আছে।
নেত্রকোনা জেলার পাঁচটি নির্বাচনী আসনে মোট ভোটার ২০ লাখ ৪৪ হাজার ৭৩৬ জন। জেলার ৬৭৬টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬৬৫টির গণভোটের ফলাফলে দেখা যায়, ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৫ লাখ ৮৯ হাজার ২৮৩টি। আর ‘না’ ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৭৪৭টি।
একইভাবে কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা) আসনে ১৪৬টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০৩টির ফলাফল পাওয়া গেছে। এখানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ১৪টি। আর ‘না’ ভোট পেয়েছে ৩৮ হাজার ৫৪৬টি।
ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছে ৯৪ হাজার ৬০৫টি। ‘না’ ভোট পেয়েছে ২৭ হাজার ৪৯৭টি। ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনে ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছে ৫১ হাজার ৮৭৫টি। ‘না’ ভোট পেয়েছে ২৫ হাজার ৪০১টি।
রাজশাহী–১ আসনেও ‘হ্যাঁ’ ভোট এগিয়ে আছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে ‘হ্যাঁ’ ৪০ হাজার ৬১১ ভোট পেয়ে এগিয়ে আছে। এখানে ‘না’ পেয়েছে ১৩ হাজার ৯২৯ ভোট।
এর বাইরে হবিগঞ্জ–১, পাবনা–২, পটুয়াখালী–১, কুমিল্লা–১, ৭ ও ৮, পিরোজপুর–২, জয়পুরহাট–২, বাগেরহাট– ১ ও ৩, চট্টগ্রাম–১, ৭, ১৪ ও ১৫, ফেনী–২ ও ৩ এবং চাঁদপুর–৩ আসনে গণভোটের সর্বশেষ ফলাফল অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ এগিয়ে আছে।
অবশ্য রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি—এই দুটি সংসদীয় আসনে গত রাত ১টা পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ ফলাফলে (আংশিক) ‘হ্যাঁ’ ভোট পিছিয়ে আছে। রাঙামাটির ২১৪টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৭৪টির ফলাফল পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, ‘হ্যাঁ’ পেয়েছে ২২ হাজার ৮৬৮ ভোট। আর ‘না’ পেয়েছে ৬১ হাজার ২৬২ ভোট।
অন্যদিকে খাগড়াছড়ির ২০৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪১টি কেন্দ্রের ফলাফল পাওয়া গেছে। এখানেও ‘হ্যাঁ’ পিছিয়ে আছে। ‘হ্যাঁ’ পেয়েছে ৩০ হাজার ৬৬৫ ভোট। আর ‘না’ পেয়েছে ৩১ হাজার ৭৬ ভোট।
‘হ্যাঁ’ জিতলে কী হবে
গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হলে সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পথ খুলবে। এতে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কিছু ক্ষেত্রে বাড়বে। সাংবিধানিক পদে নিয়োগ হবে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রায় সব নির্বাহী কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে অন্য যেকোনো কাজ করতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী।
এ ছাড়া কোনো বিষয়ে সংসদে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার আওতা বাড়বে। সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে।
হ্যাঁ ভোট জয়ী হলে আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। সংবিধান সংশোধন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসবে। কোনো একটি দলের চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান সংশোধন করা কঠিন হবে।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের অঙ্গীকার করে। এ লক্ষ্যে ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। এরপর আরও কয়েকটি খাতে সংস্কারের সুপারিশ দিতে কমিশন করা হয়।
প্রথমে গঠন করা ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে ১৬৬টিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য তৈরির লক্ষ্যে গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রম শুরু হয়। ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কমিশনের দীর্ঘ আলোচনা শেষে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবে ঐকমত্য ও সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো নিয়ে তৈরি করা হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ। এই প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান–সম্পর্কিত। অন্য প্রস্তাবগুলো সরকারি আদেশ, অধ্যাদেশ জারি বা আইন বিধি করে বাস্তবায়ন সম্ভব। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের কিছু প্রস্তাব ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
কিন্তু সংবিধান–সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো অধ্যাদেশ বা কোনো আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। জুলাই জাতীয় সনদে থাকা সংবিধান–সম্পর্কিত এই ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ১৯টি মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব হিসেবে চিহ্নিত করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
মূলত সংবিধান–সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে তিনটি স্তর। প্রথমত, আইনি ভিত্তি দিতে আদেশ জারি। গত ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করেন রাষ্ট্রপতি।
বাস্তবায়নের দ্বিতীয় স্তরে হয়েছে গণভোট। এই গণভোট হয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সংস্কার–সম্পর্কিত অংশ নিয়ে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে তৃতীয় স্তর শুরু হবে। এ ক্ষেত্রে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংস্কার সম্পন্ন করবে। তবে পরিষদ নির্দিষ্ট সময়ে সংবিধান সংস্কার না করলে কী হবে, তা বাস্তবায়ন আদেশে উল্লেখ নেই।
সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, এক ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে থাকবেন না, এমন বিধানও প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাব নিয়ে বিএনপির ভিন্নমত ছিল।
এখন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতিকে কাজ করতে হয়। তবে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে কারও পরামর্শ বা সুপারিশ ছাড়াই নিজ এখতিয়ারে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিতে পারবেন।
জুলাই সনদে আইনসভা বা সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা এবং উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সংবিধান সংশোধন করতে নিম্নকক্ষের দুই–তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন লাগবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম

















