শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ

ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ

ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে প্রকৌশল বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভূমিকম্পে অধিকাংশ মানুষ সরাসরি কম্পনের কারণে নয়, বরং ভবন ও অবকাঠামো ধসে পড়ার কারণে প্রাণ হারায়।

একই মাত্রার ভূমিকম্পে কোনো কোনো ভবন অক্ষত থাকে, আবার কোনো ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ে। এর প্রধান কারণ ভবনের নকশা, নির্মাণমান এবং প্রকৌশলগত নিয়ম মেনে নির্মাণ করা হয়েছে কি না। তাই ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় সঠিক ডিজাইন ও মানসম্মত নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই।


কেন ভবনের ডিজাইন গুরুত্বপূর্ণ?


ভূমিকম্পের সময় মাটির কম্পনের ফলে ভবনের ওপর অনুভূমিক (Lateral) এবং গতিশীল (Dynamic) বল কাজ করে। সাধারণ ভবনগুলো মূলত উল্লম্ব লোড বহনের জন্য তৈরি করা হলেও ভূমিকম্পের সময় অনুভূমিক বলই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যদি ভবনকে এসব বল সহ্য করার উপযোগী করে ডিজাইন না করা হয়, তাহলে সামান্য সময়ের মধ্যেই কাঠামোগত ব্যর্থতা দেখা দিতে পারে।

খারাপ ডিজাইনের সাধারণ ত্রুটি

বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে এখনও বিভিন্ন ধরনের প্রকৌশলগত ত্রুটি দেখা যায়, যা ভূমিকম্পের সময় মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।

প্রথমত, “সফট স্টোরি” বা দুর্বল নিচতলা অন্যতম বড় সমস্যা। অনেক ভবনের নিচতলা গ্যারেজ, দোকান বা খোলা জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে নিচতলায় পর্যাপ্ত দেয়াল বা কাঠামোগত শক্তি থাকে না। ভূমিকম্পের সময় এই তলাটি অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ে এবং প্রথমে ধসে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, অনিয়মিত বা অসম আকৃতির ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ। L-Shape, U-Shape বা অসম ভারবণ্টনযুক্ত ভবনে ভূমিকম্পের সময় মোচড় (Torsion) সৃষ্টি হয়, যা ভবনের নির্দিষ্ট অংশে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।

তৃতীয়ত, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার একটি বড় সমস্যা। নিম্নমানের কংক্রিট, অপর্যাপ্ত রড, সঠিকভাবে কংক্রিট কিউরিং না করা কিংবা নির্মাণ ত্রুটি ভবনের স্থায়িত্বকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে ডিজাইন ভালো হলেও বাস্তবে কাঠামো ব্যর্থ হতে পারে।

চতুর্থত, অনেক ক্ষেত্রে লোড কীভাবে ফাউন্ডেশন পর্যন্ত পৌঁছাবে তা সঠিকভাবে বিবেচনা করা হয় না। প্রকৌশল ভাষায় একে Load Path বলা হয়। সঠিক Load Path না থাকলে ভবনের বিভিন্ন অংশে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় এবং দ্রুত কাঠামোগত ব্যর্থতা দেখা দেয়।

পঞ্চমত, ভূমিকম্প প্রতিরোধী ডিজাইনের একটি মৌলিক নীতি হলো “Strong Column – Weak Beam”। অর্থাৎ কলামকে বিমের তুলনায় অধিক শক্তিশালী হতে হবে। কারণ কলাম ব্যর্থ হলে পুরো ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।


কীভাবে ভালো ডিজাইন জীবন বাঁচায়?


একটি ভালো ডিজাইনকৃত ভবন ভূমিকম্পের সময় সম্পূর্ণ অনড় থাকার চেষ্টা করে না; বরং নিয়ন্ত্রিতভাবে শক্তি শোষণ করে এবং কিছুটা বিকৃত হয়। এই বৈশিষ্ট্যকে Ductility বা নমনীয়তা বলা হয়।

এছাড়া ভালো ডিজাইনে Redundancy বা বিকল্প লোড বহন ব্যবস্থা থাকে। ফলে ভবনের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরো কাঠামো ধসে পড়ে না। একই সঙ্গে সুষম আকৃতি, যথাযথ Structural Detailing এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করলে ভবনের নিরাপত্তা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা

বাংলাদেশ, বিশেষ করে ঢাকা মহানগরী, একটি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখনও অনেক ভবন জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধান ছাড়াই নকশা ও নির্মাণ সম্পন্ন হয়। আবার অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণও একটি সাধারণ প্রবণতা।

এসব কারণে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থেকে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ভবন নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা মূল্যায়নও জরুরি।


নেপাল ভূমিকম্পের শিক্ষা

২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্প আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ওই ভূমিকম্পে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পেছনে ছিল দুর্বল নকশা, নিম্নমানের নির্মাণ এবং প্রকৌশলগত ত্রুটি। অন্যদিকে, আধুনিক প্রকৌশল নীতিমালা অনুসরণ করে নির্মিত অনেক ভবন সফলভাবে টিকে ছিল।

এটি প্রমাণ করে যে ভূমিকম্পের মাত্রা নয়, বরং ভবনের প্রস্তুতিই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে।

করণীয়

প্রকৌশলীদের অবশ্যই সঠিক Structural Analysis, Seismic Design এবং যথাযথ Detailing নিশ্চিত করতে হবে। নির্মাণকাজের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে হবে।

অন্যদিকে ভবনের মালিকদেরও সচেতন হতে হবে। অনুমোদিত নকশা ব্যবহার, দক্ষ প্রকৌশলী নিয়োগ, মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস না করাই হতে পারে ভবিষ্যৎ বিপর্যয় থেকে বাঁচার অন্যতম উপায়।


উপসংহার:

ভূমিকম্প থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। সঠিক প্রকৌশল নকশা, মানসম্মত নির্মাণ এবং জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়।

আজকের দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল নির্মাণ সংস্কৃতি। কারণ একটি নিরাপদ ভবন শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং একটি পরিবারের নিরাপত্তা, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের প্রতীক।

সঠিক ডিজাইন = নিরাপদ জীবন

মানসম্মত নির্মাণ = টেকসই ভবিষ্যৎ

খারাপ ডিজাইন = নিশ্চিত ঝুঁকি


লেখক: প্রকৌশলী হাসানুল বান্না বিভাগীয় প্রধান, প্রকৌশল বিভাগ, স্টুডিও ডিএনএ প্রতিষ্ঠাতা, হেলদি কংক্রীট ও হেলদি এডুকেশন

লেখক: প্রকৌশলী হাসানুল বান্না

বিভাগীয় প্রধান, প্রকৌশল বিভাগ, স্টুডিও ডিএনএ

প্রতিষ্ঠাতা, হেলদি কংক্রীট ও হেলদি এডুকেশন

সম্পাদক : আবদুল মাতিন