মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

শরিকদের সঙ্গে মতভিন্নতা থাকতে পারে, বিভেদ নেই: প্রধানমন্ত্রী

শরিকদের সঙ্গে মতভিন্নতা থাকতে পারে, বিভেদ নেই: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় ও বৈঠক করেছেন যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিএনপির মিত্র রাজনৈতিক দল ও জোটের শীর্ষ নেতারা। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এ বৈঠক হয়। সেখানে শরিক নেতাদের নিয়ে নৈশভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার গঠনের পর এই প্রথম যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী।


শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শরিক দলগুলোর মধ্যে ‘মতভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু কোনো বিভেদ নেই। আমরা একসঙ্গে আছি, একসঙ্গে ছিলাম, ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও একসঙ্গে থাকব। আমাদের মধ্যে ডিফেন্স অব অপিনিয়ন হতে পারে, কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। ৩১ দফার মাধ্যমে আমরা একটি জায়গায় একত্র হয়েছি। আমাদের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য এক।’


অনেকদিন বসার সুযোগ হয়নি বলে দুঃখ প্রকাশ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটি দফা কীভাবে বাস্তবায়ন করব এ ব্যাপারে কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। আমাদের ৩১ দফার আলোকে হোক এবং জুলাই সনদের আলোকে হোক আমরা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।’


অতীতের আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, “আমরা যখন আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। ‘গুপ্ত’ তাদের কিন্তু ওই সময়ে আমরা অনেক খুঁজেছি, তাদের পাইনি। আপনারা কি কেউ রাজপথে পেয়েছিলেন তাদের?” দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখার জন্য যে কোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখার জন্য আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করব। কারণ জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে। আসুন আগে আমরা দায়িত্বটা পালন করি। তারপর আমরা নিজেদের নিয়ে ভাবি।’


রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে আমরা ৩১ দফা সর্বপ্রথম ঘোষণা করেছিলাম উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, “সংস্কার নিয়ে এখন অনেক বড় বড় কথা বলেছেন—এই মানুষগুলো বা এই রাজনৈতিক দলগুলোকে তখন সংস্কারের ‘স’ বলতে দেখিনি। তখন স্বৈরাচারের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র সংস্কারের দফাগুলো আমরা দিয়েছিলাম।” তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, নির্বাচনে জনগণ ৩১ দফার পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন এই ৩১ দফা শুধু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নয়; বরং বাংলাদেশের জনগণের ৩১ দফা হয়ে গেছে।’


৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের পর একটি ‘গুপ্তবাহিনী’ সক্রিয় হয়ে নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের সময় ডিজিটাল মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছিল বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। তার দাবি, স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ পেলে বাংলাদেশের জনগণ সবসময় দেশের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয় এবং সর্বশেষ নির্বাচনেও তারই প্রতিফলন ঘটেছে।


অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘উনি (উপদেষ্টা) বলছিলেন যে ১৮ মাসে তারা কত অসহায় ছিলেন। উনি বলছেন, সরকারে ৬০ শতাংশের ওপরে সেই গুপ্তবাহিনীর ইনফ্লুয়েন্স ছিল। আমরা দেখেছি নির্বাচনের পর এই গুপ্তবাহিনীকে দিশেহারার মতো বক্তব্য রাখতে এবং এখনো তারা বিভিন্ন রকম বক্তব্য রাখছে। কিন্তু ১২ তারিখে যখন জনগণ তাদের রায় প্রদান করেছে, তারপর থেকে তাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে।’


মান-অভিমান ভেঙেছে শরিকদের: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের পর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির গরমিলে বিএনপির সঙ্গে মিত্রদের অনেকের সঙ্গেই দূরত্ব ও টানাপোড়েন চলছিল। পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ বা নিয়মিত আলোচনা না হওয়ায় মতবিনিময় সভায় তারা হতাশা প্রকাশ করেন। তবে এই বৈঠকে তাদের মান-অভিমান দূর হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।


মিত্রদের দাবি, স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে।


বৈঠকে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা প্রতিশ্রুতি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সরকারের পাঁচ মাসে নেওয়া নানা পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়। শরিক নেতারা সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। একইসঙ্গে আগামী দিনে বিএনপি সরকারকে উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া কয়েকজন নেতা বলেন, সরকার ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ইতিবাচক মনোভাবের পর মিত্র নেতাদের জমে থাকা মান-অভিমান দূর হয়েছে। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।


সভায় অংশ নেওয়া বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক কালবেলাকে বলেন, “আমরা জানতে চেয়েছি, নির্বাচনের পর ‘একলা চলো’ নীতি অবলম্বন করছেন কি না? শরিকদের মধ্যে অবিশ্বাস-সন্দেহ বেড়ে চলছে। পাঁচ মাসে কয়েক হাজার নিয়োগ দিয়েছেন, কিন্তু যুগপতের কোনো শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করেননি। শরিকদের সঙ্গে পথচলা এখানেই শেষ করছে কি না? লম্বা পথ চলতে হলে মানুষের বন্ধু প্রয়োজন হয়, একা একা লম্বা পথ চলা যায় না। তাহলে সবাইকে আস্থায় নেওয়া দরকার।”


তিনি বলেন, “আমরা জানতে চেয়েছি, আপনি শরিকদের সঙ্গে আবার বৈঠক শুরু করতে চাইছেন কি না? তখন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এটা ‘ওয়েলকাম ডিনার’। এখন থেকে নিয়মিত শরিকদের বৈঠক করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।”


নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী শরিক নেতাদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে কুশল বিনিময় করেন। তিনি বুফে দাঁড়িয়ে শরিক নেতাদের সঙ্গে খাবার নেন এবং তাদের সঙ্গে একটি টেবিলে খাবার খান। এ টেবিলে ছিলেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী, ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু প্রমুখ।


প্রেস বিফ্রিংয়ে যা বললেন মির্জা ফখরুল: মতবিনিময় সভা শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের সময় ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতেই রাষ্ট্র সংস্কার হবে। একইসঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর মিত্র দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।


জাতীয় ঐক্য ধরে রাখা, রাষ্ট্র সংস্কারের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে সমন্বয় জোরদারে প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতেও নিয়মিতভাবে মিত্র রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ও মতবিনিময় করবেন। ব্রিফিংয়ের শুরুতে জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নিহত শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারের অবসান ঘটিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে। আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী আন্দোলনকারীদের অবদানও জাতি চিরদিন স্মরণ করবে।


বৈঠকে অংশ নেয়নি দুই দল: বৈঠক সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বৈঠকে ৪১ রাজনৈতিক দলের ১৮৪ জন সদস্য অংশ নেন। তবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। ক্ষমতার পাঁচ মাস পার হলেও বিএনপি সরকারে যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই দল দুটি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী কালবেলাকে বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্ত আমরা আপাতত যাইনি। আমরা আরও সময় নিতে চাই। আমরা এককভাবে বৈঠক করতে চাই। নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের কার্যক্রম আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। সরকারের ভালো কাজকে স্বাগত জানাই।’

সম্পাদক : আবদুল মাতিন