‘কে ওই শোনালো মোরে আযানের ধ্বনি, মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিলো কি সুমধুর, আকুল হইলো প্রাণ, নাচিলো ধমনী। কি মধুর আযানের ধ্বনি’। সেই বিখ্যাত ‘আযান’ কবিতার রচয়িতা মহাকবি কায়কোবাদের ৭৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।
মহাকবি ১৯৫১ সালে ২১ জুলাই বার্ধক্যজনিত কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পুরাতন আজিমপুর কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়। কায়কোবাদ ১৮৫৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার আগলা পূর্বপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকাল ১০টায় কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ‘মহাকবি কায়কোবাদ স্মৃতি সংসদ’র পক্ষ থেকে কবির সমাধিস্থল জিয়ারত ও দোয়া মাহফিল করা হবে। এ ছাড়াও বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রাজধানীর বাংলা একাডেমির আল মাহমুদ কর্নারে মহাকবির স্মরণানুষ্ঠানে তার জীবন, সাহিত্যকর্ম ও অবদানের স্মৃতিচারণ করা হবে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
‘মহাকবি কায়কোবাদ স্মৃতি সংসদ’র অন্যতম সদস্য ইতালী প্রবাসী বিষ্ণুপদ সাহা জানান, কবির গ্রাম আগলায় আমার বাড়ি। ছোটবেলা থেকে তার প্রতি আমার বিশেষ টান। প্রবাসে থাকলেও প্রতি বছরই কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার চেষ্টা করি। কবির প্রতি যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা তা প্রকাশ করার মতো নয়। সংগঠনের পাশে থেকে আমি চেষ্টা করি, কবির নাম সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়ার।
‘মহাকবি কায়কোবাদ স্মৃতি সংসদ’র সদস্য ও সাংস্কৃতিক কর্মী এস এম আজাদ রহমান জানান, আমি আগলা গ্রামের বাসিন্দা। জন্মের পর থেকেই কবিকে জেনেছি। সেই থেকে তার প্রতি অগাধ ভালোবাসায় মিশে আছি। আমরা সংগঠনের মাধ্যমে চেষ্টা করছি কবিকে স্মৃতি হিসেবে বাঁচিয়ে রাখার। এরই মধ্যে ঐতিহাসিক আগলা পোস্ট অফিস এলাকায় মহাকবির নামে একটি ফটক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একজন বিশিষ্টজন সেটি করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ধীরে ধীরে আমরা আরও কিছু কাজ করে যেতে চাই।
কবি ১৯০৪ সালে অমর কাব্যগ্রন্থ ‘মহাশ্মশান’ লিখে মহাকবি উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। এই রকম অসংখ্য কবিতাসহ আধুনিক শুদ্ধ বাংলায় গীতিকাব্য, কাহিনি কাব্য, কাব্য উপন্যাস রচনা করে গেছেন তিনি। তিনি ছিলেন খাঁটি বাঙালি এবং মুসলমান। ১৮৫৭ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৯৪ বসর পর্যন্ত তিনি এই পৃথিবীর মাঝে বেঁচে ছিলেন। জীবনের সুদীর্ঘ ৮২ বছরই তিনি বাংলা সাহিত্য নিয়ে চর্চা করেছেন।
১৮৭০ সালে কবির মাত্র ১২ বৎসর বয়সে প্রথম কাব্যগ্রন্থ বিরহ বিলাপ প্রকাশিত হয়। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ কুসুম ‘কাননে’ প্রকাশিত হয় ১৮৭৩ সালে। এ দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পরপরই তিনি কবি হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করেন। ১৮৯৬ সালে প্রকাশিত হয় তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ অশ্রুমালা। এ অশ্রুমালা প্রকাশের পর থেকেই কায়কোবাদ সাহিত্য সমাজে প্রতিষ্ঠিত হন। কবি নবীন চন্দ্র সেন, সম্পাদক বঙ্গবাসী, ঢাকা গেজেট ও কলকাতা গেজেট অশ্রুমালায় ভূয়সী প্রশংসা করেন।
এরপর তিনি শিবমন্দির, অমিয় ধারা, মহরম শরীফ বা আত্ম বিসর্জন কাব্য, শ্মশান ভস্ম তার জীবদ্দশায় এসব গ্রন্থ প্রকাশ হয়ে থাকে। কবির মৃত্যুর পর প্রকাশ হয় প্রেমের ফুল, প্রেমের রানী, প্রেম পারিজাত, মন্দাকিনি ধারা ও গাউছ পাকের প্রেমের কুঞ্জ। এমনিভাবে কবির মোট ১৩টি কাব্যগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে উপহার রেখে গেছেন।
কথিত আছে, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর কবির বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি তার বংশধরদের মধ্য থেকে হাতছাড়া হয়ে যায়। তা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম
























