সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইরানবিরোধী বিক্ষোভে গ্রেপ্তার যমজ বোনের একজনের মৃত্যুদণ্ড

ইরানবিরোধী বিক্ষোভে গ্রেপ্তার যমজ বোনের একজনের মৃত্যুদণ্ড

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার দুই যমজ বোনের একজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যজনকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বোন তারানেহ রহিমি এবং তার যমজ বোন রোমিনা রহিমি গত জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন।


দুই বোনের বয়স তখন ১৯ বছর এবং তারা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়তেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, মুখোশ পরা কয়েকজন ব্যক্তি গভীর রাতে তাদের বাড়িতে ঢুকে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তিরা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের বা আইআরজিসির পাঠানো সদস্য ছিলেন।


চার মাস ধরে হাসপাতাল ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নেওয়ার পর তাদের মা মারজিয়ে নুরমোহাম্মাদি জানতে পারেন, তার দুই মেয়ে কারাগারে রয়েছেন। মে মাসে ইসফাহানের দৌলতাবাদ কারাগারে মেয়েদের দেখতে গিয়ে তিনি তাদের শারীরিকভাবে গুরুতর আহত অবস্থায় দেখতে পান বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।


যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী তাদের চাচাতো ভাই মাসুদ নুরমোহাম্মাদির দাবি, দুই বোনের মাথার চুল টেনে তাদের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেওয়া হয়েছিল। এতে তাদের মাথার বিভিন্ন অংশে চুল উঠে গিয়েছিল এবং মুখে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশেও আঘাত ছিল বলে তিনি জানান।


ইরানবিরোধী বিক্ষোভে গ্রেপ্তার যমজ বোনের একজনের মৃত্যুদণ্ড

একাধিক ফ্রন্ট থেকে ইসরায়েলে বড় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান

নুরমোহাম্মাদি আরও দাবি করেন, কারাগারে তারানেহকে বলা হয়েছিল, স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষর না করলে তার বোন রোমিনাকে কারারক্ষীরা তার সামনেই ধর্ষণ করবে।


ইরানের আদালতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তারানেহকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং রোমিনাকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে দুই বোনের সাজায় এত বড় পার্থক্যের কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। সাজা ঘোষণার পর থেকে পরিবারের সদস্যরা তাদের আর দেখতে পারেননি।


নুরমোহাম্মাদি বলেন, তারানেহর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায়কে তিনি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক মনে করেন। তার ধারণা, সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করতেই তারানেহকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যাতে অন্যরা ভবিষ্যতে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে।


গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর ইরানে এখন পর্যন্ত ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারির সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে অন্তত ২৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১৬ জন নারী।


এ ছাড়া শত শত বিক্ষোভকারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে অথবা এমন অভিযোগে বিচার করা হচ্ছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। ইসফাহানেই এ ধরনের অভিযোগে ৭০ জনের বেশি মানুষ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


গত মাসে যুক্তরাজ্যসহ ৩০টি দেশ জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ডের নিন্দা জানিয়ে একটি যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছে। বিবৃতিতে এসব মৃত্যুদণ্ডকে ভিন্নমত দমনের চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।


তারানেহ ও রোমিনা ৮ ও ৯ জানুয়ারি ইসফাহানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেন। এর প্রায় এক মাস পর মুখে ব্যাগ পরানো কয়েকজন ব্যক্তি তাদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরিবারকে তাদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।


পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মেয়েদের খুঁজে পেতে তাদের মা বিভিন্ন আদালত ও হাসপাতালে যোগাযোগ করেন। পরে তাকে ফোন করে জানানো হয়, তার দুই মেয়ে কারাগারে রয়েছেন এবং সেখানে গিয়ে তাদের দেখা করতে পারবেন।


মেয়েদের কারাগারে দেখে তাদের মা প্রথমে চিনতেই পারেননি বলে জানান নুরমোহাম্মাদি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই বোনের মুখ ফুলে গিয়েছিল, শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং কনুই, হাতের আঙুল ও পায়ে গুরুতর আঘাত ছিল। তাদের চুলও টেনে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তারা একপর্যায়ে একাকী কারাবাসেও ছিল বলে জানা যায়।


তাদের মা মারজিয়ে নুরমোহাম্মাদি একাই দুই মেয়েকে বড় করেছেন। পরিবারের দাবি, তিনি তাদের বিচারেও উপস্থিত থাকতে পারেননি। আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারানেহ আদালতে জানিয়েছিলেন, তার কাছ থেকে নেওয়া স্বীকারোক্তিগুলো নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা হয়েছিল।


তবে দুই বোন বিক্ষোভের সময় কোনো সহিংসতায় জড়িত ছিলেন; এমন কোনো প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পরিবারের দাবি, বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আগে দুই বোন কখনো কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেননি।


নুরমোহাম্মাদি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তিনি জানান, তার পরিবারের সদস্যদের মামলার বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার কারণে তাকে মুঠোফোনের বার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মৃত্যুর হুমকিও দেওয়া হয়েছে।


তিনি আরও জানান, তার মা এখন তার সঙ্গে থাকেন এবং মেয়েদের কথা মনে পড়লেই তিনি কাঁদেন।


সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

সম্পাদক : আবদুল মাতিন