স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয় রংপুরের সুস্বাদু হাঁড়িভাঙা আম এখনো গাছ থেকে পারা শুরু হয়নি। প্রতি বছরের মতো এবারও জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বাজারে মিলবে জিআই পণ্য স্বীকৃত এই আম। এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে আর মাত্র এক মাস। বর্তমানে আমের বয়স প্রায় চার মাস।
প্রতি বছর হাঁড়িভাঙা আম জুনের ২০ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত শুরু হয়। তবে কৃষি অফিস বলছে, আবহাওয়া তপ্ত থাকলে এর আগেও গাছ থেকে আম পাড়া যেতে পারে। আর এই আমকে কেন্দ্র করে চলতি মৌসুমে রংপুর অঞ্চলে ৩০০ কোটি টাকার বেশি বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি অফিস ও চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাঁড়িভাঙা আমের মুকুল সাধারণত ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে আসে। এরপর কমপক্ষে পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে চাষিরা আম ঘরে তুলতে পারেন। সেই হিসেবে জুনের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সপ্তাহে বাজারে মিলবে পরিপক্ব হাঁড়িভাঙা আম।
এর আগে, বাজারে হাঁড়িভাঙা আম পাওয়া গেলেও তা হবে অপরিপক্ব। অন্যান্য অঞ্চলের আমে যখন বাজার ভরপুর তখন হাঁড়িভাঙার প্রকৃত স্বাদ পেতে একটু অপেক্ষায় থাকতে হয়। বর্তমানে বাগানগুলোতে আমের পরিচর্যা চলছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় দুই হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে হাঁড়িভাঙা আমের চাষ হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহের বৃষ্টি আম বড় ও রসালো হতে সাহায্য করলেও কালবৈশাখীর তাণ্ডবে হাঁড়িভাঙার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে প্রায় ৩০ শতাংশ ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
বেশি ফলনের সম্ভাবনা
হাঁড়িভাঙা আম এক বছর কম ফলন দেয়, পরের বছর আবার ভালো ফলন দেয়। যে বছর কম ফলন হয়, সেই বছরকে বলা হয় অফ ইয়ার। যে বছর ভালো ফলন দেয়, সেই বছরকে বলা হয়ে থাকে অন ইয়ার। এবার হাঁড়িভাঙা আমের অন ইয়ার। এবার গাছে প্রচুর আম ধরেছে, যা গত বছরের চেয়ে অনেক বেশি।
জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পদাগঞ্জ হাট এলাকার আমচাষি মেহেদী হাসান জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও আমের চাষ করেছেন। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে কিছুটা ভয়ে আছেন। তবে শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানি গ্রামের আমচাষি বেলাল হোসেন বলেন, এবার গাছে আমের মুকুল ভালোই এসেছে। গতবারের তুলনায় ফলন বেশি হবে আশা করা হয়। আম পারার মাসখানেক বাকি রয়েছে। যদি বড় ধরনের কোনো ঝড়-বৃষ্টি না হয় তাহলে আশানুরূপ লাভ হবে বলে জানান তিনি।
হাঁড়িভাঙার গোড়াপত্তনের ইতিহাস
হাঁড়িভাঙা আমের গোড়াপত্তন করেছিলেন খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানি গ্রামের নফল উদ্দিন পাইকার নামে এক বৃক্ষবিলাসী মানুষ। স্বাধীনতার আগের বছর ১৯৭০ সালে নফল উদ্দিন পাইকার ১২০ বছর বয়সে মারা যান। এখন তার লাগানো হাঁড়িভাঙা গাছটির বয়স ৭৬ বছর।
নফল উদ্দিন পাইকারের ছেলে আমজাদ হোসেন জানান, সম্ভবত ১৯৪৯ সাল, তখন তার বাবা নফল উদ্দিন এই গাছটি রোপণ করেছিলেন। উপজেলার বালুয়া মাসুমপুর গ্রামটি ছিল ঝোপজঙ্গলে ভরপুর। সেই এলাকার একটি জমি থেকে দুটি আমের চারা নিয়ে এসে কলম করেন তার বাবা। তবে একটি গাছ চুরি হয়ে যায়। বাকি গাছটিতে মাটির হাঁড়ি বেঁধে পানি (ফিল্টার সিস্টেমে) দেওয়া হতো। একদিন রাতে কে বা কারা মাটির হাঁড়িটি ভেঙে ফেলে।
১৯৯২ সাল থেকে হাঁড়িভাঙা আমের সম্প্রসারণ শুরু হয় আখিরাহাটের আব্দুস সালাম সরকারের হাত ধরে। শুধু চাষবাদ নয়, এই অঞ্চলের হাঁড়িভাঙা সম্প্রসারণে তার রয়েছে অবদান অনস্বীকার্য। তার হাত ধরেই রংপুর অঞ্চলের সম্প্রসারিত হয়েছে হাঁড়িভাঙার স্বপ্ন। মানুষ এখন অন্যান্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভের আশায় উঁচু-নিচু ও পরিত্যক্ত জমিতে প্রতিবছর হাঁড়িভাঙা আম চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
ভালো মানের হাঁড়িভাঙা চেনার উপায়
হাঁড়িভাঙা আমের বৈশিষ্ট্য হলো এটি আঁশবিহীন, মিষ্টি ও সুস্বাদু। এই আমের আঁটিও খুব ছোট। ছাল পাতলা। প্রতিটি আমের ওজন হয় ২০০ থেকে ৩০০ গ্রাম। সাধারণত জুন মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এই আমের বাজারজাত শুরু হয়।
ভালো মানের হাঁড়িভাঙা আম চেনার উপায় প্রসঙ্গে আমজাদ হোসেন বলেন, হাঁড়িভাঙা আমের ওপরটা যত কালচে, ভেতরে ততোই সুন্দর। এর স্বাদ ও মিষ্টি লোভনীয়। দেখতে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন আমে কীটনাশক ও স্প্রে ব্যবহার বাগান কিনে নেওয়া ব্যবসায়ীরা নিজেদের লাভের জন্য করে থাকেন। এতে আম দেখতে ভালো, সুন্দর ও পাকা রঙের মনে হয়।
চাষিরা বলছেন, হাঁড়িভাঙা আম পাকলে এটি তিন-চার দিনের বেশি রাখা যায় না। সংরক্ষণের কোনো কার্যকর পদ্ধতি নেই। যদি এই আম সংরক্ষণের সঠিক প্রক্রিয়া থাকত, তাহলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হতো।
বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা
২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হাঁড়িভাঙা আম রংপুরের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম























