বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ধীরগতিতে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সরকারের উন্নয়ন সক্ষমতা বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছে। এরফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেস্থবিরতা বিরাজ করছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) মাত্র ৩৬.১৯ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে তা ৩৬.৬৫ শতাংশ ছিলো। তার আগের তিন অর্থবছরে প্রথম ৯ মাসে বাস্তবায়নের হার ৪১ থেকে ৪৫ শতাংশের বেশি ছিলো। দুই দশকের মধ্যে চলতি অর্থবছর সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়নের রেকর্ড গড়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের ৯ মাসের উন্নয়ন ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আর আগের অর্থবছরের একই সময়ে ৮২ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৭ হাজার ২৮৭ কোটি টাকা ব্যয় কমেছে। এরমধ্যে একক মাস হিসেবে গত মার্চ মাসে ৫.৮৮ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের মার্চের চেয়েও কম। তবে এরইমধ্যে সরকার বড় ধরনের কাটছাঁট করে দুই লাখ কোটি টাকায় নামিয়েছে সংশোধিত এডিপির আকার।
বাজেটে মূল এডিপি ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। তা থেকে কমানো হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট হয়েছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে কমানো হয়েছে ৭৩ শতাংশ বরাদ্দ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা খাতে ৫৫ শতাংশ বরাদ্দ।
সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার বিভাগ চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সবচেয়ে বেশি ১৮ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা খরচ করেছে। তারপর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ খরচ করেছে ৮ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। আর বিদ্যুৎ বিভাগ খরচ করেছে ৭ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। ৬ হাজার ২৬২ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় খরচ করেছে ৫ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খরচ করছে ২ হাজার ১৩ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ মাত্র ২৬৬ কোটি টাকা খরচ করেছে আর ৬৭৮ কোটি টাকা খরচ করেছে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। গত অর্থবছরের শেষে দেশে মাত্র ৬৮ শতাংশ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল।
সূত্র জানায়, এবার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে ৩০ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত উন্নয়ন বাজেট বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) দুই লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে। তার মধ্যে সরকারের অর্থায়ন বা স্থানীয় মুদ্রায় এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। আর ৭২ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক সহায়তা প্রকল্প ঋণ বা অনুদান ধরা হয়। চলতি অর্থবছরে মূল এডিপির আকার দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছিলো। অথচ গত ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দের ব্যয় হয়েছিল ৬৭.৮৫ শতাংশ, যা তার আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৮০.৬৩ শতাংশের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম। মূলত ২০০৪-০৫ অর্থবছরের পর থেকে দেশে এতো কম এডিপি বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাকি তিন মাসে ৬৫.৮১ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে হবে। যা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের মতে, অনেক প্রকল্প বছরের পর বছর ধরে চললেও বাস্তব অগ্রগতি খুব সীমিত। যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন হার ১০ শতাংশের নিচে, সেগুলো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। একইভাবে ৩০ শতাংশের কম অগ্রগতির প্রকল্পগুলোর যৌক্তিকতা নতুন করে যাচাই করা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় ও রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া প্রকল্প বাদ দিয়ে অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে অগ্রাধিকার দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ প্রয়োজন। বর্তমানে এডিপি বাস্তবায়নের এই ধীরগতি উদ্বেগজনক।
মোহাম্মদ জোবায়ের আহমেদ | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম




















