মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬

শত বছর পর মিলল নতুন প্রজাতির ক্ষুদ্র বন্য বিড়ালের সন্ধান

শত বছর পর মিলল নতুন প্রজাতির ক্ষুদ্র বন্য বিড়ালের সন্ধান

দক্ষিণ আমেরিকার বলিভিয়ার মেঘে ঢাকা পাহাড়ি বনাঞ্চলে সন্ধান মিলেছে নতুন এক প্রজাতির ক্ষুদ্র বন্য বিড়ালের। স্থানীয়দের কাছে ‘তিলকায়ো’ নামে পরিচিত এই বিড়ালকে জিনগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানের কাছে নতুন প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো জীবিত বিড়ালের নতুন কোনো প্রজাতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নাম দেওয়া ও বর্ণনা করা হলো।


গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, তিলকায়ো বলিভিয়ার ইয়ুংগাসের ঘন পাহাড়ি বনে বাস করে। অঞ্চলটি প্রায়ই মেঘে ঢাকা থাকে এবং সেখানে আর্দ্রতাও অনেক বেশি। প্রাণীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৬ সেন্টিমিটার এবং ওজন প্রায় ১ দশমিক ৪ কেজি। অর্থাৎ এটি সাধারণ গৃহপালিত বিড়ালের চেয়েও ছোট।


গবেষকেরা নতুন প্রজাতিটির বৈজ্ঞানিক নাম দিয়েছেন ‘লেপারডাস তিলকায়ো’। স্থানীয় নামটিও রাখা হয়েছে। প্রাণীটির গায়ের লোম হালকা বাদামি এবং শরীরজুড়ে অনিয়মিত আকৃতির গোলাকার দাগ রয়েছে।


গবেষক পাওলা নোগালেস-আসকারুনস জানান, প্রাণীটির জীবনযাপন ও স্বভাব সম্পর্কে এখনো খুব বেশি তথ্য জানা যায়নি। এর মল পরীক্ষা করে ছোট ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এ ধরনের প্রাণী এর খাদ্যের অংশ হতে পারে। ক্যামেরায় ধারণ করা ছবিতে আবার দেখা গেছে, এটি রাতে বেশি সক্রিয় হতে পারে।


গবেষকেরা জানান, বাঘবিড়াল গোত্রের প্রাণীগুলো দেখতে অনেকটা একই রকম হওয়ায় শুধু বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখে তাদের আলাদা করা কঠিন। এ কারণেই আগে বাঘবিড়ালকে একটি মাত্র প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে কয়েক দশক আগে জিনগত গবেষণায় একাধিক প্রজাতির অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।


নতুন প্রজাতিটি শনাক্ত করতে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করা ৩৮টি বাঘবিড়ালের জিনগত নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে আটটি ছিল জাদুঘরে সংরক্ষিত নমুনা। গবেষণায় দেখা যায়, বাঘবিড়াল আসলে জিনগতভাবে স্বতন্ত্র পাঁচটি প্রজাতির সমষ্টি।


গবেষকদের জিনগত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তিলকায়োর বংশধারা প্রায় ১৪ লাখ বছর আগে অন্য বাঘবিড়াল থেকে আলাদা হয়ে যায়। গবেষকদের মতে, বিড়ালের ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ সময় ধরে জিনগত পার্থক্য থাকা সাধারণত আলাদা প্রজাতির বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।



গবেষকেরা এখন পর্যন্ত দুটি জীবিত তিলকায়োকে পরীক্ষা করেছেন। এর মধ্যে একটি ১০ বছর বয়সী পুরুষ বিড়াল বর্তমানে সেন্দা ভার্দে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে রয়েছে। এর আগে স্থানীয় একটি পরিবার প্রাণীটিকে নিজেদের বাড়িতে রেখেছিল।


গবেষণায় পেরুর ইয়ুংগাস অঞ্চলে বাঘবিড়ালের আরেকটি নতুন উপপ্রজাতির সন্ধানও পাওয়া গেছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘লেপারডাস তিগ্রিনাস আন্তিসুয়ো’। ওই অঞ্চলের প্রাচীন ইনকা সাম্রাজ্যের একটি এলাকার নাম অনুসারে উপপ্রজাতিটির নামকরণ করা হয়েছে।


গবেষকেরা তাদের নতুন তথ্য আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার কাছে জানিয়েছেন। সংস্থাটি ভবিষ্যৎ পর্যালোচনায় বাঘবিড়ালের পাঁচটি পৃথক বংশধারার ঝুঁকি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করবে। এতে প্রতিটি প্রজাতির প্রকৃত বিপন্নতার মাত্রা আরও স্পষ্ট হতে পারে। এমনকি তিলকায়োকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হলে বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।


তিলকায়োর আবাসস্থল ইয়ুংগাস অঞ্চলের পাহাড়ি বনও বর্তমানে বড় ধরনের হুমকির মুখে। বন উজাড়, কৃষি সম্প্রসারণ, মানুষের কারণে সৃষ্ট আগুন এবং খনির কার্যক্রমের কারণে এই বনাঞ্চলের ওপর চাপ বাড়ছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বন পুনরুদ্ধার, অবশিষ্ট প্রাকৃতিক বন রক্ষা এবং বিভিন্ন আবাসস্থলের মধ্যে সংযোগ বজায় রাখা জরুরি বলে মনে করছেন গবেষকেরা।


গবেষকদের মতে, বিড়ালের মতো পরিচিত প্রাণীগোষ্ঠীর মধ্যেও এখনো নতুন প্রজাতি আবিষ্কৃত হচ্ছে—এটি বিশ্বে আরও অনেক অজানা প্রাণীর অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়। তবে সেগুলো আবিষ্কারের আগেই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।




সূত্র: সিএনএন

সম্পাদক : আবদুল মাতিন