কোরআনুল কারিম মহান আল্লাহর কালাম এবং মুসলমানদের কাছে সর্বাধিক সম্মানিত গ্রন্থ। তাই কোরআন তেলাওয়াত, বহন ও স্পর্শ করার ক্ষেত্রে কী ধরনের পবিত্রতা প্রয়োজন- এ প্রশ্ন ইসলামি ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে মোবাইল অ্যাপ, অনুবাদ গ্রন্থ এবং দাওয়াতি কার্যক্রমের প্রসারে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
প্রশ্ন হলো, কোরআন স্পর্শ করার জন্য কি অজু থাকা বাধ্যতামূলক, নাকি সাধারণ পবিত্রতাই যথেষ্ট?
মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই এটি মহিমান্নিত কোরআন, যা সুরক্ষিত কিতাবে রয়েছে। একে পূত-পবিত্রগণ ব্যতিত কেউ স্পর্শ করে না।’ (সুরা ওয়াকিয়া: ৭৭-৭৯)
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরদের মধ্যে দুটি প্রসিদ্ধ মত পাওয়া যায়। একদল বলেন, এখানে ‘পবিত্রগণ’ বলতে ফেরেশতাদের বোঝানো হয়েছে, যারা লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত কোরআন স্পর্শ করেন। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.), ইকরিমা (রহ.) এবং কিছু তাফসিরবিদের বক্তব্য থেকে এ মতের সমর্থন পাওয়া যায়।
অন্যদিকে অধিকাংশ ফকিহ এ আয়াত থেকে মুসহাফ স্পর্শের জন্য পবিত্রতার প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত গ্রহণ করেছেন। যদিও তারা মূল দলিল হিসেবে হাদিসকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
এ বিষয়ে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ দলিল হলো হজরত আমর ইবনে হাযম (রা.)-এর কাছে রাসুলুল্লাহ (স.) প্রেরিত পত্রের বর্ণনা। সেখানে বলা হয়েছে, ‘পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ যেন কোরআন স্পর্শ না করে।’ (মুয়াত্তা ইমাম মালিক: ৪৬৮; দারাকুতনি: ৪৩১; বায়হাকি)
ইমাম মালিক, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ, ইবনু আবদুল বার, ইবনু কুদামা, ইমাম নববিসহ বহু মুহাদ্দিস ও ফকিহ এ বর্ণনাকে গ্রহণযোগ্য দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনু হাজর (রহ.) বলেন, এ হাদিসের একাধিক সনদ পরস্পরকে শক্তিশালী করে।
ইমাম নববি (রহ.) উল্লেখ করেন, সনদ নিয়ে আলোচনা থাকলেও উম্মাহর গ্রহণযোগ্যতা এবং একাধিক সূত্রে বর্ণিত হওয়ার কারণে অধিকাংশ ফকিহ এ হাদিসকে আমলযোগ্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। (আল-মাজমু: ২/৬৯)
এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের আমলও উল্লেখযোগ্য। ইমাম নববি (রহ.) ও ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) উল্লেখ করেন, হজরত আলী, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, সালমান ফারসি ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)সহ একাধিক সাহাবি পবিত্রতা ছাড়া কোরআন স্পর্শ না করার মত পোষণ করেছেন। (আল-মাজমু: ২/৮০; মাজমুউল ফতোয়া: ২১/২৬৬)
এ কারণেই ফিকহের অধিকাংশ গ্রন্থে মুসহাফ স্পর্শের জন্য অজুর শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
আলী (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, ‘নবী (স.)-কে কোরআন তেলাওয়াত থেকে শুধু জানাবাত ছাড়া অন্যকিছু বিরত রাখত না।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ; হাসান)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ (স.) শুধু গোসল ফরজ হলেই তেলাওয়াত থেকে বিরত থাকতেন। ফকিহগণ এই হাদিস ও আমর ইবনে হাযমের হাদিস একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে মুসহাফ স্পর্শ ও মুখস্থ তেলাওয়াতের মধ্যে পার্থক্য করেছেন।
‘পবিত্র’ ও ‘অজু’ দুটি কি একই বিষয়?
এ আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘তাহির’ (পবিত্র) শব্দের অর্থ নির্ধারণ। এখানেই মতভেদের মূল শিকড়।
কিছু আলেমের মতে, এখানে ‘পবিত্র’ বলতে শুধু বড় নাপাকি (জানাবাত, হায়েজ, নিফাস) থেকে মুক্ত অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে। তাদের যুক্তি হলো, হাদিসে ‘মুতাওয়াদ্দি’ (অজুকারী) শব্দ না বলে ‘তাহির’ (পবিত্র) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে জমহুর ফকিহদের মতে, ‘তাহির’ শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত। ছোট নাপাকি (অজু ভঙ্গ হওয়া) থেকেও পবিত্র থাকা এর অন্তর্ভুক্ত। শরিয়তে পবিত্রতার দুটি স্তর রয়েছে- তাহারাতে কুবরা (বড় পবিত্রতা) ও তাহারাতে সুগরা (ছোট পবিত্রতা)। জমহুরের মতে উভয় স্তরই মুসহাফ স্পর্শের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।
চার মাজহাবের অবস্থান
ফিকহি মতভেদ থাকা সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহর মূলধারার অবস্থান চার মাজহাবের মতামত থেকেই স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি- চার মাজহাবের জমহুর আলেমের মতে, অজু ছাড়া সরাসরি আরবি মুসহাফ স্পর্শ করা জায়েজ নয়। ইমাম নববি (রহ.) ‘আল-মাজমু’ গ্রন্থে এবং ইবনু কুদামা (রহ.) ‘আল-মুগনি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী যুগের অধিকাংশ ফকিহ একই অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
ভিন্নমত কেন রয়েছে?
কিছু আলেম যেমন ইমাম দাউদ জাহেরি, ইবনে হাযম (রহ.) এবং পরবর্তী যুগের কিছু গবেষক আলেম মনে করেন, সুরা ওয়াকিয়ার আয়াতে মানুষের অজুর প্রসঙ্গ সরাসরি উল্লেখ নেই। তাদের মতে, সেখানে ফেরেশতাদের কথা বলা হয়েছে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ‘মাজমুউল ফতোয়াতে উল্লেখ করেন, এ বিষয়ে দলিলগুলোর ব্যাখ্যায় ইজতিহাদের সুযোগ রয়েছে। তার মতে, সুরা ওয়াকিয়ার আয়াতে মূলত ফেরেশতাদের প্রসঙ্গই অধিক স্পষ্ট।
ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) ‘ইলামুল মুওয়াক্কিয়িন’ গ্রন্থে বলেন, নবী (স.) কোরআনের আয়াত লিখে বিভিন্ন শাসকের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। এ ঘটনাও বিষয়টির ভিন্নতর ব্যাখ্যার পক্ষে আলোচনায় উল্লেখ করা হয়।
তবে উল্লেখযোগ্য যে, এ মতটি সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেমদের মত নয়; বরং ইসলামি ফিকহের একটি সংখ্যালঘু মত হিসেবে পরিচিত।
বিশেষ পরিস্থিতি ও বিধান
অধিকাংশ আলেমের মতে, অজু না থাকলেও মুখস্থ কোরআন তেলাওয়াত করা জায়েজ। তবে সরাসরি মুসহাফ স্পর্শ করার জন্য অজু প্রয়োজন- এটি জমহুরের অবস্থান।
জানাবাত (গোসল ফরজ) অবস্থায় কোরআন তেলাওয়াত ও মুসহাফ স্পর্শ উভয় ক্ষেত্রেই অধিকাংশ আলেম কঠোর বিধান উল্লেখ করেছেন।
হায়েজ ও নিফাস অবস্থায় হানাফি ও মালেকি মাজহাব অনুযায়ী কোরআন তেলাওয়াত ও মুসহাফ স্পর্শ উভয়ই নিষেধ। শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত মতভেদ রয়েছে। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ও শায়খ আব্দুল আজিজ ইবনে বায (রহ.) মনে করেন, হাফেজা মহিলার জন্য ভুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে হায়েজ অবস্থায় তেলাওয়াতের অবকাশ রয়েছে।
মোবাইল ফোনে কোরআন পড়ার বিধান
সমসাময়িক অধিকাংশ আলেমের মতে, মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে কোরআন পড়া বা স্পর্শ করার জন্য অজু শর্ত নয়। কারণ ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রদর্শিত অক্ষরগুলো প্রচলিত অর্থে মুসহাফের স্থায়ী লিখিত অক্ষরের মতো নয়। তবে কোরআনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য অজু অবস্থায় তেলাওয়াত করা অবশ্যই উত্তম।
কোরআন স্পর্শের জন্য অজুর বাধ্যবাধকতা নিয়ে ফিকহি আলোচনা ও মতভেদ থাকলেও চার মাজহাবের জমহুর আলেম মুসহাফ স্পর্শের জন্য অজুকে শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাদের অবস্থানের পক্ষে ‘পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ যেন কোরআন স্পর্শ না করে’- এই হাদিস, সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং দীর্ঘ ফিকহি ঐতিহ্য রয়েছে।
অন্যদিকে কিছু আলেম এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন এবং দলিলগুলোর ভিন্নতর ব্যাখ্যার ভিত্তিতে শিথিল মত পোষণ করেছেন। তবে মতভেদ সত্ত্বেও কোরআনের মর্যাদা রক্ষা, আল্লাহর কালামের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন এবং উম্মাহর অধিকাংশ আলেমের অনুসৃত আমলের আলোকে অজু অবস্থায় মুসহাফ স্পর্শ করাই অধিক নিরাপদ, উত্তম ও সতর্কতাপূর্ণ পন্থা।
তথ্যসূত্র: সুরা ওয়াকিয়া: ৭৭-৭৯; মুয়াত্তা মালিক: ৪৬৮; দারাকুতনি: ৪৩১; আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ; আল-মাজমু: ২/৬৯-৮০; আল-মুগনি: ১/১৩৭-১৪১; আত-তালখিসুল হাবির: ১/১৩১; . মাজমুউল ফতোয়া: ২১/২৬৬; ইলামুল মুওয়াক্কিয়িন; আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহু; আল-মুহাল্লা; তাফসির ইবনে কাসির
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম
























