পুরান ঢাকার কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সরু গলি, শতবর্ষী ভবন, পুরনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আর ইতিহাসের নানা স্তর। রাজধানীর এই প্রাচীন অংশ শুধু প্রশাসনিক বা বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, বরং শত শত বছর ধরে এটি ছিল বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের প্রাণকেন্দ্র।
শাঁখা, আতর, মসলিন, স্বর্ণালঙ্কার, কাঠের কাজ কিংবা ধাতব শিল্প নানা ধরনের কারিগরি ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ ধারক এই অঞ্চল। সেই ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো তামা-কাঁসার শিল্প, যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শাখারী বাজার ও আশপাশের এলাকার ইতিহাস।
আজকের দিনে স্টেইনলেস স্টিল, মেলামাইন, কাচ এবং প্লাস্টিকের ভিড়ে তামা ও কাসার বাসনপত্র অনেকটাই স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু একসময় বাংলার ঘরে ঘরে কাঁসার থালা, বাটি, গ্লাস, ঘট, তামার কলস কিংবা পিতলের তৈজসপত্র ছাড়া সংসারের চিত্র কল্পনাই করা যেত না। সামাজিক মর্যাদা, রুচি, আভিজাত্য এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতীক ছিল এসব সামগ্রী। পুরান ঢাকার শাখারী বাজার সেই ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।
শত বছরের কারুশিল্পের কেন্দ্র
শাখারী বাজারের ইতিহাস কয়েকশ বছর পুরোনো। মুঘল আমলে ঢাকার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পেশাজীবী ও কারিগর সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে ওঠে। শঙ্খশিল্পীদের বসতি হিসেবে পরিচিতি পেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই এলাকায় তামা, কাসা ও পিতলের ব্যবসায়ীরাও তাদের অবস্থান তৈরি করেন। শাখারী বাজার, তাঁতীবাজার, বাংলাবাজার, ইসলামপুর এবং লক্ষ্মীবাজারকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ধাতব পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক।
পুরান ঢাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দশক আগেও এসব এলাকায় দিনের শুরু হতো হাতুড়ির শব্দে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছোট ছোট কারখানায় চলত ধাতু গলানো, কাটা, পেটানো ও পালিশ করার কাজ। কারিগরদের কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এসে পণ্য কিনে নিয়ে যেতেন দেশের বিভিন্ন জেলায়।
কাঁসারু সম্প্রদায়ের উত্তরাধিকার
বাংলায় তামা ও কাসার সামগ্রী নির্মাণের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িত ছিল কাঁসারু বা থাতারি সম্প্রদায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই শিল্পের দক্ষতা রপ্ত করেছেন। তাদের কাছে এটি শুধু জীবিকা নয়, বরং একটি পারিবারিক ঐতিহ্য।
একজন দক্ষ কারিগরের হাতে একটি সাধারণ ধাতব পাত ধীরে ধীরে রূপ নেয় শিল্পকর্মে। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পালিশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন হয় সূক্ষ্ম কারিগরি দক্ষতা। একটি বড় কাসার থালা তৈরি করতে কখনও কখনও কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। একইভাবে তামার কলস, ঘট বা ধর্মীয় উপকরণ তৈরিতেও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হয়।
কারিগররা জানান, এই কাজ বই পড়ে শেখা যায় না। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে দক্ষতা অর্জন করতে হয়। ফলে একজন অভিজ্ঞ কারিগরের হাতে যে নিখুঁত কাজ সম্ভব, তা নতুনদের জন্য সহজ নয়।
কাঁসা কী এবং কেন এত জনপ্রিয় ছিল
কাঁসা বা বেল মেটাল মূলত তামা ও টিনের সংমিশ্রণে তৈরি একটি ধাতব মিশ্রণ। এর রং, স্থায়িত্ব এবং শব্দের বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জনপ্রিয়। বাংলার সমাজে কাঁসার তৈরি থালা-বাটি শুধু ব্যবহার্য সামগ্রী ছিল না; এগুলো ছিল পারিবারিক সম্পদের অংশ।
একসময় বিয়ের সময় কনের জন্য কাসার বাসনপত্র দেওয়া ছিল প্রচলিত রীতি। অনেক পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই কাসার থালা বা ঘট ব্যবহার করা হতো। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বন, শ্রাদ্ধ কিংবা অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেত্রেও কাঁসার সামগ্রীর বিশেষ গুরুত্ব ছিল।
তামার পাত্রের ক্ষেত্রেও ছিল আলাদা কদর। অনেকের বিশ্বাস, তামার পাত্রে রাখা পানি স্বাস্থ্যকর এবং জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। তাই ঘরে ঘরে তামার কলস, জগ ও গ্লাস ব্যবহার করা হতো। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানেও তামার কিছু জীবাণুনাশক গুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এই বিশ্বাসকে আরও জনপ্রিয় করেছে।
শাখারী বাজারের সোনালি দিন
প্রবীণ ব্যবসায়ীদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে শাখারী বাজারের এক ব্যস্ত সময়ের ছবি। দিপু কর্মকার নামে একজন বলেন, ‘তখন প্রায় প্রতিটি দোকানেই তামা, কাসা বা পিতলের সামগ্রী পাওয়া যেত। ঈদ, দুর্গাপূজা, বিয়ের মৌসুম কিংবা অন্যান্য উৎসবের আগে দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকত।’
গ্রামাঞ্চল থেকে মানুষ বিশেষভাবে পুরান ঢাকায় আসতেন বাসনপত্র কেনার জন্য। অনেক পাইকারী ব্যবসায়ী এখান থেকে পণ্য কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করতেন। ফলে এই শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল বড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
শুধু ব্যবসা নয়, এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অসংখ্য শ্রমিক, কারিগর, পরিবহনকর্মী এবং কাঁচামাল সরবরাহকারীর জীবিকা। একটি থালা বা কলস তৈরি হওয়ার পেছনে অনেক মানুষের শ্রম জড়িয়ে থাকত।
আধুনিকতার ধাক্কা
তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বাজারে স্টেইনলেস স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম এবং পরে মেলামাইন ও প্লাস্টিকের পণ্য সহজলভ্য হয়ে ওঠে। তুলনামূলক কম দাম, হালকা ওজন এবং সহজ রক্ষণাবেক্ষণের কারণে মানুষ ধীরে ধীরে নতুন উপকরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
এর ফলে তামা-কাসার পণ্যের চাহিদা দ্রুত কমতে থাকে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তামা ও অন্যান্য ধাতুর দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলে ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে শুরু করে।
হারিয়ে যাচ্ছে দক্ষতা
তামা-কাঁসার শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ। বর্তমান সময়ে তরুণদের অনেকেই এই পেশাকে লাভজনক মনে করেন না। দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রমের তুলনায় আয় কম হওয়ায় তারা অন্য পেশা বেছে নিচ্ছেন।
ফলে শত শত বছরের অভিজ্ঞতা ও কারিগরি জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। একজন প্রবীণ কারিগর যখন কাজ ছেড়ে দেন, তখন তার সঙ্গে হারিয়ে যায় বহু অপ্রকাশিত কৌশল ও দক্ষতা। এই জ্ঞান বইয়ে লেখা থাকে না; প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হাতে-কলমে শেখানো হয়।
সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
সাংস্কৃতিক গবেষকদের মতে, তামা-কাঁসার শিল্প শুধু একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। তাই এই শিল্পকে সংরক্ষণ করা জরুরি।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, কারিগরদের জন্য সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং পর্যটনের সঙ্গে এই শিল্পকে যুক্ত করা গেলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের অংশ হিসেবে তামা-কাঁসার কারুশিল্পকে তুলে ধরা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহও বাড়তে পারে।
আজকের ব্যস্ত পুরান ঢাকায় দাঁড়িয়ে হয়তো আর আগের মতো সর্বত্র হাতুড়ির শব্দ শোনা যায় না। তবু শাখারী বাজারের কিছু দোকান ও কারখানায় এখনও সেই ঐতিহ্যের স্পন্দন টিকে আছে। চকচকে কাঁসার থালা, তামার কলস কিংবা কারিগরের হাতে ধাতু পেটানোর দৃশ্য যেন অতীতের এক গৌরবময় সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
শাখারী বাজারের তামা-কাসার শিল্প কেবল একটি হারিয়ে যেতে বসা কারুশিল্পের গল্প নয়। এটি মানুষের শ্রম, সৃজনশীলতা, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের গল্প।
আধুনিকতার দ্রুতগতির যুগে দাঁড়িয়ে এই শিল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় কিছু ঐতিহ্য শুধু অর্থনৈতিক মূল্যে নয়, একটি জাতির স্মৃতি ও পরিচয়ের কারণেও অমূল্য। সেই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা মানে অতীতের সঙ্গে ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন রক্ষা করা।
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম
























