বাংলাদেশের নারী আন্দোলন, শিক্ষা বিস্তার, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের সংগ্রামের ইতিহাসে হেনা দাস একটি উজ্জ্বল নাম। তিনি ছিলেন এমন একজন সমাজসংস্কারক, যিনি সারাজীবন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারীর মর্যাদা রক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
হেনা দাস জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, সিলেটে। শৈশব থেকেই তিনি প্রগতিশীল চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। শিক্ষাজীবন শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন এবং শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং মানুষকে সচেতন, মানবিক ও স্বাধীনচেতা করে তোলার শক্তিশালী হাতিয়ার।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে, যখন নারী-পুরুষ সমান মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেতৃত্বে থেকে হেনা দাস নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রতিরোধ, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন এবং আইনি সহায়তা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি মনে করতেন, নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা, শিক্ষা এবং সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রশ্নেও তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়। ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আজীবন কাজ করেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সম্প্রীতি, সহনশীলতা এবং মানবিকতা একটি সভ্য সমাজের প্রধান ভিত্তি।
একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে তিনি নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর শিক্ষাদর্শ ছিল-শিক্ষা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য নয়, বরং একজন সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির জন্য।
হেনা দাস ২০০৯ সালের ২০ জুলাই পরলোকগমন করেন। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সংগ্রাম ও অবদান আজও বাংলাদেশের নারী আন্দোলন, মানবাধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সংগ্রামে প্রেরণার উৎস হয়ে আছে।
আজ তাঁর প্রয়াণবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই অসাধারণ নারীকে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—ন্যায়, সমতা, মানবিকতা এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্য আপসহীন সংগ্রামই একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়। নতুন প্রজন্ম যদি তাঁর আদর্শ ধারণ করতে পারে, তবে একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার পথ আরও সুদৃঢ় হবে।
হেনা দাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর আদর্শ চিরকাল আমাদের পথ দেখাক।
ডেস্ক | বাংলাবাজার পত্রিকা.কম
























